৬:১৬ অপরাহ্ণ
হঠাৎ বিরল প্রজাতির ‘উল্টোলেজি’ বানরের মায়াবী উপস্থিতিতে মুখরিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান
চারিদিকে গাছগাছালির সবুজের সমারোহ, পাখির কলকাকলি আর ছায়ায় ঘেরা শান্ত পরিবেশ। হঠাৎ করেই উঁচু গাছের মগডাল থেকে নামলো একদল চঞ্চল প্রাণী। পিঠের দিকে বাঁকানো ছোট লেজ, হালকা সোনালি-বাদামি পশমে ঢাকা শরীর এদের দেখলেই চোখ আটকে যায় প্রকৃতিপ্রেমীদের। বলছিলাম বাংলাদেশের বনাঞ্চলের অন্যতম বিরল ও বিপন্ন প্রাণী ‘উল্টোলেজি বানর’ এর কথা।
বেশ কয়েকদিন ধরে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে দেখা মিললো এই দুর্লভ বানর দলের। শান্ত পরিবেশে নিজেদের স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় তাদের এই চলাচল উদ্যানে আসা পর্যটক ও প্রকৃতিপ্রেমীদের মন কেড়ে নিয়েছে। উল্টোলেজি বানর ইংরেজি ভাষায় এদের বলা হয় ‘Northern pig-tailed macaque’। শূকরের লেজের মতো পিঠের দিকে বাঁকানো লেজ থাকার কারণেই এদের বাংলায় ‘উল্টোলেজি বানর’ বলা হয়ে থাকে। তবে স্থানীয়দের কাছে এদের বিচিত্র সব নাম রয়েছে, কেউ ডাকেন ‘কেশরওয়ালা সিংহ বানর’, কেউ ‘কুলু বান্দর’, আবার কারো কাছে এরা ‘উলু বান্দর’ বা ‘ছোট লেজি বানর’ নামে পরিচিত। সাধারণত ২০ থেকে ২৫টির ছোট-বড় সামাজিক দল নিয়ে গভীর বনে বাস করে এরা।
প্রধান খাদ্য হিসেবে পছন্দ করে বনের নানান ফলমূল ও গাছের কচিপাতা। লাউয়াছড়া ছাড়াও শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ ও হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান এবং রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে এখনও এদের কিছুটা উপস্থিতি বেড়েছে ।আইইউসিএন (IUCN)-এর তথ্যমতে: বৈশ্বিকভাবে ও সামাজিকভাবে এই প্রজাতিটিকে ‘সংকটাপন্ন’ (Vulnerable) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী উল্টোলেজি বানর একটি সংরক্ষিত প্রাণী। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের প্রাকৃতিক রূপ যেমন মানুষকে মুগ্ধ করে, তেমনি বনের বুক চিরে চলে যাওয়া আখাউড়া–সিলেট রেলপথ বুনো বাসিন্দাদের জন্য বড় এক আতঙ্কের নাম।
রেললাইনের আশেপাশে প্রায়ই এসব উল্টোলেজি বানরের বিচরণ চোখে পড়ে। কিন্তু দ্রুতগতির ট্রেন চলাচলের সময় আকস্মিক দুর্ঘটনায় অনেক বন্যপ্রাণীকে প্রাণ হারাতে হয়, যা এদের অস্তিত্বের জন্য এখন বড় হুমকি। বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক জানান,অতিসংকটাপন্ন ও বিপন্ন প্রজাতির উল্টোলেজি বানরের ছোট-বড় মিলিয়ে একটি দল বর্তমানে এখানে নিরাপদে বাস করছে। বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পক্ষ থেকে আমরা সতর্কতার সঙ্গে এদের গতিবিধি নজরদারিতে রাখছি।এছাড়া বন্যপ্রাণীর খাদ্য উপযোগী গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে।
দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও সমৃদ্ধ ট্রপিক্যাল রেইনফরেস্ট লাউয়াছড়া দেখতে প্রতিদিন দেশ-বিদেশের শত শত পর্যটকের পদচারণা ঘটে। বনের গহীনে বিরল প্রজাতির এই উল্টোলেজি বানরের উপস্থিতি উদ্যানটির সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের এক উজ্জ্বল নিদর্শন। উপযুক্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও ট্রেন চলাচলে সচেতনতা নিশ্চিত করা গেলে এই বিরল প্রজাতির প্রাণীরা তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখে লাউয়াছড়াকে আরও সমৃদ্ধ করে রাখবে এমনটাই প্রত্যাশা বনবিভাগ ও পরিবেশবাদীদের।