সোমবার, আগস্ট ৩, ২০ ২৬
ডেস্ক রিপোর্ট
৩ আগস্ট ২০ ২৬
৪:২৯ অপরাহ্ণ

জুলাই গণভ্যুত্থানে ঢাল হয়েছিলেন, তবুও স্বীকৃতি মেলেনি জুলাই যোদ্ধা দুলাল মিয়ার

জুলাই গণভ্যুত্থানের সময় ছাত্রজনতার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হলেও আজও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত জুলাই যোদ্ধা দুলাল মিয়া। আহত শরীর, মাথায় রয়ে যাওয়া গুলি আর মানবেতর জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে দিন কাটলেও দুই বছরেও “জুলাই যোদ্ধা” হিসেবে তার নাম গেজেটে ওঠেনি। অথচ আন্দোলনের মাঠে তিনি ছিলেন এক সাহসী অভিভাবক, যিনি নিজের সন্তানদের নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং তাদের ভবিষ্যতের জন্য বুক পেতে দিয়েছিলেন বুলেটের সামনে।

দুলাল মিয়ার বাড়ি হবিগঞ্জ সদর উপজেলার সয়দাবাদ গ্রামে। পিতা প্রয়াত নুর মিয়া এবং মাতা নুরজাহান বেগম। বর্তমানে তিনি সিলেটের কুমার গাও (ভার্সিটি গেইট) এলাকার ফরিদ ম্যানশনে বসবাস করেন। পেশায় প্রাইভেট সার্ভিসে যুক্ত দুলাল মিয়া দুই সন্তানের জনক। তার ছেলে দিরহানুল ইসলাম আব্দুল্লাহ ভার্সিটি স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং মেয়ে দিনা আক্তার অরিফা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্রজনতার গণভ্যুত্থান চলাকালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন দুলাল মিয়া।

দুই সন্তান যখন রাজপথে নামেন, তখন একজন বাবা হিসেবে ঘরে বসে থাকতে পারেননি তিনি। শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে মিছিল, স্লোগান এবং মিডিয়ার সামনে জোরালো বক্তব্য দিতে থাকেন। এক পর্যায়ে তিনি পুলিশের টার্গেটে পরিণত হন। এর আগে সিলেট কোর্ট পয়েন্টে শিক্ষার্থীদের পক্ষে “আমি একজন বাবা, যত বুলেট আছে আমার বুকে মারো, আমার সন্তানদের বুকে নয়” এই স্লোগান লেখা ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে পুলিশের হাতে আটক হন দুলাল মিয়া।

পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হলেও নজরদারিতে রাখা হয়। ১৯ জুলাই আন্দোলন চলাকালে ভার্সিটি এলাকায় পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন তিনি এবং পুনরায় পুলিশের হাতে আটক হয়ে নির্যাতনের শিকার হন। আন্দোলনের আগে ও পরবর্তী সময়ে একাধিকবার রাবার বুলেটে আহত হন দুলাল মিয়া। চিকিৎসকরা তার শরীর থেকে ছয়টি গুলি বের করলেও এখনো মাথায় একটি গুলি রয়ে গেছে।

মাথায় গুলি নিয়েই তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং মানবেতর জীবনযাপন করছেন। চিকিৎসার জন্য নিজের সামান্য সঞ্চয় ও সম্পদ ব্যয় করে আজ তিনি প্রায় নিঃস্ব। দুলাল মিয়া বলেন, “আমি আন্দোলন করেছি সন্তানদের জন্য। যখন দেখেছি আমার দুই সন্তান অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের বুলেট ও টিয়ার শেলের মুখোমুখি হচ্ছে, তখন নিজে ঘরে বসে থাকতে পারিনি।

নিজের সন্তান ও সন্তানসম শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো আমার নৈতিক দায়িত্ব ছিল।” তিনি আরও বলেন, এক সময় তার শিশু সন্তান দিরহানুল ইসলাম আব্দুল্লাহ তার হাতে লাঠি তুলে দিয়ে বলেছিল, “বাবা বসে থাকার সময় নেই, রাস্তায় মোকাবিলা করেই বিজয় আনতে হবে।” নিউজ চ্যানেল ও সোশ্যাল মিডিয়ায় দুলাল মিয়ার আন্দোলনের ভিডিও প্রকাশ ও ভাইরাল হলে পুলিশি নির্যাতনের আশঙ্কায় তিনি নিজ এলাকা হবিগঞ্জে আত্মগোপনে চলে যান। পরে ৪ আগস্ট স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুই সংসদ সদস্য আবু জহির ও মজিদ খান অস্ত্রসহ দলবল নিয়ে ছাত্রজনতার ওপর হামলা চালালে সেখানে তুমুল সংঘর্ষ হয়। সে সময়ও অসুস্থ শরীর নিয়েই দুলাল মিয়া টেটা যুদ্ধে অংশ নেন এবং গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।

এরপর দীর্ঘদিন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। এত ত্যাগ, রক্ত আর যন্ত্রণা সত্ত্বেও জুলাই যোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় গেজেটে তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে দুলাল মিয়া বলেন, “আমি ছাত্রজনতার সঙ্গে আন্দোলনে ছিলাম, রাস্তায় পুলিশের গুলি খেয়েছি, মার খেয়েছি।

আমি ভেবেছিলাম সরকার নিজে থেকেই আমাকে খুঁজে জুলাই যোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত করবে। আমি কেন ধরনা দেব?” তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “আজ দেখছি অনেক ভূয়া জুলাই যোদ্ধার নাম গেজেটে উঠেছে, কিন্তু আমার মতো প্রকৃত আহত যোদ্ধাদের অনেকের নামই গেজেটে নেই।” গুলিবিদ্ধ শরীর নিয়ে বেঁচে থাকা দুলাল মিয়ার প্রশ্ন এখন একটাই-যারা বুক পেতে দিয়েছিলেন, যারা সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন, তাদের স্বীকৃতি কি কেবলই অবহেলার তালিকায় থাকবে?

ফেইসবুক কমেন্ট অপশন
এই বিভাগের আরো খবর
পুরাতন খবর খুঁজতে নিচে ক্লিক করুন


আমাদের ফেসবুক পেইজ