বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০ ২৬
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
১৬ সেপ্টেম্বর ২০ ২৬
৬:৪০ অপরাহ্ণ

ছাত্রী হোস্টেল বন্ধ, বিপাকে শিক্ষার্থীরা

সরকারি অর্থে নির্মিত ছাত্রী হোস্টেল। রয়েছে আবাসিক ভবন, থাকার সুযোগ সুবিধাও। অথচ প্রয়োজনের সময় সেটিই শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যত বন্ধ। একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জামালগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজের ছাত্রী হোস্টেল নিয়মিত আবাসিক কার্যক্রমের বাইরে থাকায় বিপাকে পড়েছেন দূরদূরান্ত থেকে আসা ছাত্রীরা। দীর্ঘদিনেও তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় হোস্টেলটি পুরোপুরি চালু না হওয়ার কারণ নিয়েও তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

সুনামগঞ্জের হাওর অধ্যুষিত জামালগঞ্জ উপজেলার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ জামালগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজ। এটি ১৯৮৫ সালে স্থাপিত হয় এবং ২০১৮ সালে জাতীয়করণ হয়। প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সহজ করতে সরকার বিপুল পরিমাণ বরাদ্দ দিয়ে কলেজের ছাত্রী হোস্টেল নির্মাণ করা হয়েছিল। হোস্টেল চালুর পর দূরবর্তী এলাকার ছাত্রীদের আবাসন সংকট অনেকটাই কমে এসেছিল।

কিন্তু একটি ঘটনার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। হোস্টেল বন্ধ থাকায় এখন অনেক ছাত্রীকে মেস কিংবা ভাড়া বাসায় থেকে পড়াশোনা করতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা বলেন, মেস বা ভাড়া বাসায় থাকার কারণে পরিবারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি অপরিচিত পরিবেশে থাকা নিয়ে ছাত্রী ও অভিভাবকদের মধ্যে নিরাপত্তা উদ্বেগও রয়েছে।

বিশেষ করে প্রত্যন্ত হাওরাঞ্চল থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য কলেজের নিজস্ব আবাসিক ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি দীর্ঘদিন কার্যত ব্যবহার না হওয়ায় ভোগান্তি বাড়ছে। তাদের দাবি, আগের ঘটনার পর তাদের মধ্যে যে ভয় ভীতি তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে কলেজ প্রশাসনকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দ্রুত হোস্টেলের নিয়মিত কার্যক্রম চালুর দাবি তাদের।

হোস্টেল বন্ধের ঘটনায় তৎকালীন হোস্টেল সুপার মুজিবুর রহমানকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে। একই ঘটনায় গঠন করা হয়েছিল তদন্ত কমিটি। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও সেই তদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এখানেই উঠছে বড় প্রশ্ন ঘটনার প্রকৃত কারণ কী ছিল? তদন্ত কমিটি কী পেয়েছিল? কোনো অনিয়ম বা প্রশাসনিক ত্রুটি পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? আর তদন্ত শেষ হয়ে থাকলে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন? এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর না পাওয়ায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা কাটছে না। এদিকে সাবেক হোস্টেল সুপার মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত না থেকেও কলেজের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার এবং হোস্টেলের অর্থের হিসাব যথাযথভাবে না দেওয়ার বিষয়। এমনকি হোস্টেলের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে সাবেক হোস্টেল সুপার মুজিবুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগগুলো সঠিক নয় বলে দাবি করেন। তিনি আরও বলেন, আমি কলেজে সবচেয়ে বেশি ক্লাস করি যারা আমার নামে এমন কথা বলছেন তারা নিয়মিত ক্লাস করেন না বলে উল্টো অভিযোগ করেন। হোস্টেলের টাকা আত্মসাৎদের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি যখন হোস্টেলের দ্বায়িত্বে ছিলাম তখন হোস্টেলে ছাত্রীই ছিলনা।

শিক্ষক পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও প্রভাষক (অর্থনীতি) মোঃ রফিকুজ্জামান বলেন, বিগত দিনে ছাত্রী হোস্টেলে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে আমরা কিছু জানিনা। তবে এই ঘটনার পর থেকে ছাত্রী হোস্টেলে কেউ আসতে চায় না।

তদন্ত প্রতিবেদন আসার পর যদি ছাত্রী ও অভিভাবকদের নিয়ে একটি সমাবেশ করা যায় ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় তাহলে হয়তো ছাত্রী হোস্টেলটি আবারও চালু হতে পারে। এতে করে দূর দুরান্ত থেকে আসা ছাত্রীরা ক্লাস ও প্রাইভেট পড়ে উন্নত শিক্ষা গ্রহন করে আলোকিত ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করতে পারবে। কলেজ প্রশাসনের দাবি, হোস্টেলে শিক্ষার্থীদের থাকার প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা রয়েছে। তবে আগের ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হওয়া ভয় ভীতিই বর্তমানে বড় বাধা।

জামালগঞ্জ সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কাজল চন্দ্র সাহা বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আমরা এখনো পাইনি। তবে আবাসিক হোস্টেলে সকল সুযোগ সুবিধা আছে। শিক্ষার্থীরা চাইলেই সেখানে উঠতে পারবে। আগের একটি ঘটনার পর থেকে তাদের মধ্যে ভয়ভীতি কাজ করছে। অধ্যক্ষের বক্তব্যে হোস্টেলে থাকার সুযোগ থাকার কথা বলা হলেও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শুধু অবকাঠামো থাকলেই আবাসিক ব্যবস্থা কার্যকর হয় না নিরাপত্তা ও আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।

হোস্টেল সংকটের পাশাপাশি কলেজটিতে শিক্ষক কর্মচারীর ঘাটতির বিষয়টিও সামনে এসেছে। প্রয়োজনের তুলনায় জনবল কম থাকায় শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। একটি সরকারি কলেজে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা জরুরি।

ফলে শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ না হলে এর প্রভাব শিক্ষা কার্যক্রমে আরও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। জামালগঞ্জ সরকারি কলেজের ছাত্রী হোস্টেলকে ঘিরে বর্তমানে তিনটি বিষয় সামনে এসেছে হোস্টেলের নিয়মিত কার্যক্রম বন্ধ থাকা, তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া এবং নিরাপত্তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের আস্থার সংকট। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষক কর্মচারীর জনবল সংকট ও সাবেক হোস্টেল সুপারের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগ। শিক্ষার্থীদের দাবি, ঘটনার তদন্ত দ্রুত শেষ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে।

অভিযোগের সত্যতা থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও স্পষ্ট করতে হবে। একই সঙ্গে হোস্টেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে শিক্ষার্থীদের আস্থা ফিরিয়ে নিয়মিত আবাসিক কার্যক্রম চালু করতে হবে। সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিল্পী রানী মোদক জানান, আমি আসার পর ঘটনাটি জানতে পেরে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জেলায় প্রেরণ করি।

এবিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) শাকিলা রহমানের কার্যালয়ে গিয়ে উনাকে পাওয়া যায়নি পরে মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কল ধরেন নি। তাই উনার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্মিত একটি সরকারি আবাসিক স্থাপনা যদি দীর্ঘদিন কার্যত ব্যবহারহীন থাকে, তাহলে সেটির উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই শুধু হোস্টেলের দরজা খুলে দেওয়া নয় কেন বন্ধ ছিল, কী ঘটেছিল, তদন্তের ফল কী এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ জবাবই এখন সবচেয়ে জরুরি

ফেইসবুক কমেন্ট অপশন
এই বিভাগের আরো খবর
পুরাতন খবর খুঁজতে নিচে ক্লিক করুন


আমাদের ফেসবুক পেইজ