রবিবার, মার্চ ২৯, ২০ ২৬
আসহাবুজ্জামান শাওন, কমলগঞ্জ::
২৮ মার্চ ২০ ২৬
৪:৪৫ অপরাহ্ণ

শিক'লবাঁধা ৪৫ বছর বয়সী কাইয়ুমের জীবন: দারিদ্র্যে যেন জীবন্ত প্রতিচ্ছবি

তার দুই হাত ও এক পা শিকল দিয়ে বাঁধা, যার একপ্রান্ত খুঁটির সঙ্গে আটকানো। এ অবস্থায় মাটির ঘরের ছোট্ট বারান্দায় একটি চাটাইয়ের ওপর শুয়ে আছেন কাইয়ুম মিয়া।পরনে মলিন টি-শার্ট ও লুঙ্গি, শরীরের ভঙ্গিতে স্পষ্ট ক্লান্তি ও অসহায়ত্ব। দীর্ঘদিন শিকলে আবদ্ধ থাকার কারণে তার হাত ও পায়ের গোড়ালিতে কালো দাগ পড়ে গেছে।

কখনো তিনি চুপচাপ শুয়ে থাকেন, আবার কখনো হঠাৎ করে ইসলামিক মারিফাতি গান গেয়ে ওঠেন, কখনো চিৎকার করেন। এই দৃশ্য যেন একজন মানুষের ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার এক নীরব সাক্ষী। সম্প্রতি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের কাউয়ারগলা গ্রামের কাইয়ুম মিয়ার বাড়িতে গিয়ে এ দৃশ্য দেখা গেলো। ৪৫ বছর বয়সী কাইয়ুম মিয়া—একটি নাম, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসহায়ত্ব, দারিদ্র্য আর মানবিক সংকটের এক নির্মম বাস্তবতা।


মানসিক ভারসাম্য হারানো এই মানুষটি আজ তিন মাস ধরে শিকলবন্দি জীবন কাটাচ্ছেন নিজ বাড়ির বারান্দায়।পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, কাইয়ুম মিয়ার অস্বাভাবিক আচরণ দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই তাকে শিকলবন্দি করে রাখা হয়েছে। অন্যথায় তিনি ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করেন, কখনো নিজের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠেন।তার স্ত্রী জাহানারা বেগম জানান, আমরা খুব কষ্টে আছি। স্বামীর চিকিৎসা তো দূরের কথা, ঠিকমতো খাওয়াতেও পারি না। তার কণ্ঠে ছিল অসহায়ত্বের ভারী ছাপ। চার সন্তানের এই পরিবারে অভাব যেন নিত্যসঙ্গী।

বড় মেয়ে জান্নাতুন আক্তার (১৮) এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে চেয়েও মানসিক ভারসাম্যহীন বাবাকে সার্বক্ষণিক সময় দিতে গিয়ে পরীক্ষা দেননি। বড় ছেলে আবুল মিয়া (১৬) অষ্টম শ্রেণির পর পড়াশোনা বন্ধ করে দিয়েছে। ছোট ছেলে সোহেল মিয়া ও মেয়ে জয়তুন আক্তার এখনও পড়াশোনা চালিয়ে গেলেও, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে তাদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।পরিবারের সদস্যরা জানান, কাইয়ুম মিয়াকে শিকলমুক্ত রাখলে তিনি ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর শুরু করেন। ইতোমধ্যে তার কারণে ঘরের মাটির দেয়াল ভেঙে গেছে, কাঠের খাটও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এমন অবস্থায় নিরাপত্তার কথা ভেবে শিকলই যেন পরিবারের শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিন মাস আগে তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার অবনতি হলে আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাকে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসক কিছু ওষুধ লিখে দিলেও আর্থিক সংকটের কারণে তা দীর্ঘদিন চালানো সম্ভব হয়নি।

পরবর্তীতে আবার হাসপাতালে নেওয়ার কথাও থাকলেও অর্থাভাবে তা আর বাস্তবায়িত হয়নি।কাইয়ুম মিয়ার বসতঘরও তাদের দুরবস্থার সাক্ষ্য বহন করছে। জরাজীর্ণ মাটির ঘর, বৃষ্টিতে পানি ঢোকে, চারপাশে ভাঙাচোরা পরিবেশ—সব মিলিয়ে এটি যেন দারিদ্র্যের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

বর্তমানে এই পরিবারটি সম্পূর্ণভাবে মানবিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা জানান, সমাজের বিত্তবান ও সহানুভূতিশীল মানুষ এগিয়ে এলে কাইয়ুম মিয়ার চিকিৎসা ও পরিবারের জীবনযাত্রা কিছুটা হলেও স্বাভাবিক হতে পারে। এই পরিবারটিকে বাঁচাতে এখনই সহায়তার হাত বাড়ানো প্রয়োজন। নয়তো চিকিৎসার অভাবে একদিকে যেমন একজন মানুষ নিঃশেষ হয়ে যাবে, অন্যদিকে তার সন্তানদের ভবিষ্যৎও অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখার জন্য সরকার ও সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন তার প্রতিবেশীরা।

ফেইসবুক কমেন্ট অপশন
এই বিভাগের আরো খবর
পুরাতন খবর খুঁজতে নিচে ক্লিক করুন


আমাদের ফেসবুক পেইজ