৫:৫৮ অপরাহ্ণ
পরিবেশ রক্ষায় তরুণ সমাজের ভূমিকা: ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য আজকের অঙ্গীকার
পরিবেশ আজ শুধু একটি আলোচনার বিষয় নয়; এটি মানবসভ্যতার অস্তিত্বের প্রশ্ন। জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ু ও পানিদূষণ, বনভূমি ধ্বংস, প্লাস্টিক বর্জ্যের বিস্তার এবং জীববৈচিত্র্যের ক্রমাগত হ্রাস বিশ্বকে এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, যেখানে উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশও এই সংকটের বাইরে নয়। ভৌগোলিক অবস্থান, উচ্চ জনঘনত্ব এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকির কারণে পরিবেশগত ক্ষতির প্রভাব এ দেশের ওপর আরও তীব্রভাবে পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে তরুণ সমাজকে কেবল ভবিষ্যতের নেতৃত্ব হিসেবে নয়, বর্তমানের পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হিসেবেও দেখতে হবে। দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। তাদের উদ্ভাবনী চিন্তা, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা, সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণের সক্ষমতা এবং স্বেচ্ছাসেবী মনোভাব পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পরিবেশ রক্ষার প্রথম ধাপ শুরু হয় ব্যক্তিগত অভ্যাস থেকে। অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো, পানি ও বিদ্যুতের অপচয় রোধ, গাছ লাগানো ও পরিচর্যা করা, বর্জ্য যথাযথভাবে পৃথকীকরণ এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা—এসব ছোট উদ্যোগ সম্মিলিতভাবে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
একজন তরুণ যখন নিজে সচেতন হন, তখন তিনি পরিবার, বন্ধু ও সমাজের অন্যদেরও উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জনসচেতনতা তৈরির অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। তরুণরা চাইলে পরিবেশবিষয়ক সঠিক তথ্য, গবেষণালব্ধ উপাত্ত এবং ইতিবাচক উদ্যোগ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন।
একই সঙ্গে গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের পরিবর্তে বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনা ও সচেতনতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশবান্ধব সংস্কৃতি গড়ে তোলার উপযুক্ত ক্ষেত্র।
পরিবেশবিষয়ক বিতর্ক, সেমিনার, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং জলবায়ু সচেতনতা কার্যক্রমে তরুণদের অংশগ্রহণ একটি দায়িত্বশীল প্রজন্ম গড়ে তুলতে সহায়তা করে। এসব কার্যক্রম যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে নিয়মিত চর্চায় পরিণত হয়, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। তবে পরিবেশ রক্ষার দায় কেবল তরুণদের নয়।
রাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পরিবেশ আইন কার্যকর প্রয়োগ, নদী ও বনভূমি রক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর মতো নীতিগত উদ্যোগ বাস্তবায়ন না হলে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। তরুণরা এসব বিষয়ে ইতিবাচক জনমত গঠন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। কিন্তু পরিকল্পনার সফলতা নির্ভর করে নাগরিক অংশগ্রহণের ওপর। সেই অংশগ্রহণে তরুণ সমাজের উপস্থিতি যত শক্তিশালী হবে, পরিবেশ সংরক্ষণের সম্ভাবনাও তত বাড়বে।
পরিবেশ রক্ষা কোনো একদিনের কর্মসূচি নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দায়িত্ব। আজকের তরুণ যদি পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনকে অভ্যাসে পরিণত করেন এবং অন্যদেরও উদ্বুদ্ধ করেন, তবে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, বাসযোগ্য ও সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
কারণ পৃথিবী আমরা পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার হিসেবে পাইনি; আমরা এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছ থেকে ধার নিয়েছি। সেই ধার যথাযথভাবে ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আজ আমাদের সবার, আর সেই দায়িত্ব পালনে তরুণ সমাজই হতে পারে সবচেয়ে শক্তিশালী অগ্রদূত। লেখক: মাওলানা মুফতী ছালিম আহমদ খাঁ, সংগঠক ও সমাজকর্মী