৫:১৩ অপরাহ্ণ
বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়: প্রকৃতি যার বর্ননায় প্রানবন্ত
প্রকৃতির অপরূপ বর্ননামূলক গল্প ও উপন্যাসের এক মহান স্রস্টা বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় । তাঁর অনন্য সাহিত্য প্রতিভার আড়ালে ছিল একটি সংবেদনশীল মন যার সাহায্যে তিনি প্রকৃতির মাঝে ঘটে যাওয়া ঘটনার অসামান্য বিবরন প্রদান করে তাঁর সাহিত্য সম্ভারকে অন্যরকম উচ্চতায় নিয়ে গেছেন । তিনি মূলত উপন্যাস ও ছোটগল্প লিখে খ্যাতি অর্জন করেন।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের এক অতি পরিচিত নাম। তাঁর লেখা পথের পাচাঁলী এবং চাঁদের পাহাড় উপন্যাস দুটি আজও সকল বাঙালীর মন কাড়ে অনন্য ভাললাগায় । তার উলেখযোগ্য রচনাবলীর মধ্যে পথের পাঁচালী, অপরাজিত, আরণ্যক, আদর্শ হিন্দু হোটেল, ইছামতী, অশনি সংকেত, মেঘমল্লার, তালনবমী, চাঁদের পাহাড়, দৃষ্টিপ্রদীপ,দেবযান অন্যতম। বাংলার পল্লীর অপরূপ সৌন্দর্য বিভূতিভূষণকে শৈশব থেকেই মুগ্ধ করত । ফলে অতি অকিঞ্চিৎকর লতা – গুল্ম , ফুল – পাতা , পাখি , প্রকৃতির বুকের নিভৃতে লালিত প্রতিটি জীবনকে অতি নিবিড় ভাবে দেখার ও জানার সুযােগ পান । পরবর্তী কালে এই প্রকৃতি পাঠের বিস্তীর্ণ অভিজ্ঞতা নানাভাবে তার রচনাকে প্রভাবিত ও সমৃদ্ধ করেছে ।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৯৪ খ্রিঃ ১২ ই সেপ্টেম্বর কাচড়াপাড়ার নিকটবর্তী ঘােষপাড়া – মুরাতিপুর গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন । পিতার নাম মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় , মাতার নাম মৃণালিনী দেবী । তাদের আদি নিবাস ছিল যশাের জেলার অন্তর্ভুক্ত বনগ্রাম মহকুমায় অবস্থিত ইচ্ছামতী নদীতীরস্থ ব্যারাকপুর গ্রামে । বাল্য ও কৈশাের কাটে দারিদ্র্য , অভাবে ও অনটনের মধ্যে । তার শিক্ষা শুরু হয় গৃহে পিতার নিকটে । শৈশব থেকেই তিনি মেধার পরিচয় দেন । ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাশ করেন ১৯১৪ খ্রিঃ বনগ্রামের হাইস্কুল থেকে ।
কলকাতার রিপন কলেজ থেকে ১৯১৬ খ্রিঃ আই . এ ও ১৯১৮ খ্রিঃ ডিস্টিংশন নিয়ে বি . এ . পাশ করেন । উচ্চতর পড়াশােনার জন্য এম . এ . ও ল ’ ক্লাশে ভর্তি হন । কিন্তু সংসারের প্রবল চাপে পরে পড়া বন্ধ রেখে চাকুরি নিতে বাধ্য হন । কলেজে বি.এ. তৃতীয় বার্ষিক শ্রেণিতে পড়ার সময় বিভূতিভূষণের সঙ্গে বসিরহাটের মােক্তার কালীভূষণ মুখােপাধ্যায়ের কন্যা গৌরী দেবীর বিবাহ হয় । কিন্তু বিয়ের অল্পকাল পরেই গৌরীদেবীর অকালমৃত্যু ঘটে । এই দুর্ঘটনার বহুদিন পরে ৩ রা ডিসেম্বর ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত ছয়গাঁও নিবাসী যােড়শীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা রমাদেবীকে তিনি বিবাহ করেন । এই দ্বিতীয় বিবাহ বিভূতিভূষণের সাহিত্য জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে ।
কর্মজীবন শুরু করেন বিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চাকুরি দিয়ে । প্রথমে হুগলী জেলার জঙ্গীপাড়া গ্রামের স্কুলে । পরে সােনারপুর হরিণাভি স্কুল এবং পরে কলকাতার খেলাতচন্দ্র মেমােরিয়াল স্কুলে । হরিনাভি স্কুল থেকে নতুন স্কুলে চাকুরি নেবার আগে মধ্যবর্তী সময়ে তিনি কোনােরাম পােদ্দারের গােরক্ষিনী সভার প্রচারের কাজ করেন । তারপর খেলাতচন্দ্রের বাড়িতে গৃহশিক্ষকতার সূত্রে তার প্রাইভেট সেক্রেটারি ও পরে ভাগলপুর জমিদারীতে নায়েব তহশিলদারের কাজ করেন । ভাগলপুর শহরে বসবাস করতে থাকেন । এইভাগলপুর বাস করার তার অমর উপন্যাস ‘ পথের পাঁচালী রচিত হয় । অবশ্য পরে শিক্ষকতার কাজে ফিরে যান এবং শেষ জীবন পর্যন্ত গােপাল নগর স্কুলে শিক্ষকতা করেন । তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্প ‘ উপেক্ষিত ‘ , ১৩২৮ বঙ্গাব্দে প্রবাসী পত্রিকায় মাঘ সংখ্যায় ছাপা হয় । প্রথম উপন্যাস ‘ পথের পাঁচালী ‘ যেটি প্রকাশিত হয় ১৩৩৬ বঙ্গাব্দে । প্রথম উপন্যাসই তাকে খ্যাতিমান কথা সাহিত্যিকের প্রতিষ্ঠা এনে দেয় । এরপর সাহিত্যচর্চার দীর্ঘ একুশ বছরের পরিসরে তিনি বহু উপন্যাস , ছােটগল্প , ভ্রমণকাহিনী এবং শিশু – সাহিত্য রচনা করেন । বাংলার পল্লীপ্রকৃতির সঙ্গে গ্রাম্য জীবনের দুঃখ , দারিদ্র্য , স্বপ্ন , আশা , প্রেম , ভালবাসার্তার রচনায় অপরিসীম দরদের সঙ্গে চিত্রিত হয়েছে । কেবল পল্লীপ্রকৃতিই নয় , তার রচনায় অরণ্য ধরা পড়েছে । তার সমস্ত রহস্যময়তা , প্রাণােচ্ছল সজীবতা ও বৈচিত্র্য নিয়ে । অরণ্য প্রকৃতির এক অপরিচিত লীলায়িত রূপ বিধৃত হয়েছে তার বিখ্যাত ‘ আরণ্যক উপন্যাসে । একুশ বছরে সাহিত্যজীবনে গল্প , উপন্যাস , দিনলিপি , শিশুসাহিত্য মিলিয়ে প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন । এর মধ্যে নিঃসন্দেহে ‘ পথের পাঁচালী ’ ও ‘ অপরাজিত সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যকীর্তি । জীবনের শেষ দশ বৎসর বিভূতিভূষণ তাঁর অতি প্রিয় পিতৃভূমি ব্যারাকপুরে বাস করেছিলেন । এই সময়ে তিনি অজস্র শ্রেষ্ঠ পর্যায়ের সাহিত্য সৃষ্টি করেন । অনেকগুলি কালােচিত উপন্যাস ও বহু সার্থক ছােট গল্প এই সময়েই রচিত হয় । ১৯৫০ খ্রিঃ ১ লা নভেম্বর এই কালােজয়ী ঔপন্যাসিক বিভূতিভূষণ ৫৬ বছর বয়সে পরলােক গমন করেন। রােমাঞ্চক স্থানে ভ্রমণের মনােজ্ঞ কাহিনী তিনি বর্ণনা করেছেন তার বনে পাহাড়ে ও ‘ হে অরণ্য কথা কও ‘ নামক গ্রন্থদ্বয়ে এবং তার দিনলিপি জাতীয় গ্রন্থাবলীতে । কিশােরদের জন্য লিখেছেন মিমিদের কবচ , মরণের ডংকা বাজে , হীরা মানিক জ্বলে , চাদের পাহাড় প্রভৃতি । বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী ইংরাজি ও ফরাসী ভাষায় অনূদিত হয়েছে । মৃত্যুর পরে ইচ্ছামতী উপন্যাসের জন্য তাকে রবীন্দ্র পুরস্কারে ভূষিত করা হয় । চরিত্রের উপস্থাপন, অতুলনীয় গদ্য আর দৈনন্দিন জীবনকে বাস্তবিকভাবে সাহিত্যে তুলে আনা থেকে ভাষার অপরূপ উপস্থাপন সবকিছু মিলিয়ে তার লেখা বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে বাংলা সাহিত্যে যার জুড়ি মেলা ভার।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ নিলয় ১৭৪/৩: , নতুন পাড়া সুনামগঞ্জ। ০১৭১৬৭৩৮৬৮৮ sdsubrata2022@gmail.com