৮:১১ অপরাহ্ণ
আবেগঘন পরিবেশে ও রাজকীয় সম্মানে বিদায় নিলেন প্রবীন আলেম মাওলানা আব্দুল মালিক লালোপাড়ী
জকিগঞ্জে ৩৫ বছরের ইমামতির ইতি, অ'শ্রু'সিক্ত বিদায়
পবিত্র মসজিদের মেহরাবে দাঁড়িয়ে টানা ৩৫ বছর ইমামতি করেছেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে মানুষকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, শি'শুদের হাতে তুলে দিয়েছেন কোরআনের সবক, শিখিয়েছেন নৈতিকতা ও দ্বীনের পথ। সেই পরিচিত কণ্ঠ, সেই প্রিয় মুখ শুক্রবার যেন হঠাৎই থেমে গেল মানিকপুর পূর্ব দক্ষিণ জামে মসজিদের মেহরাবে। অ'শ্রু'সিক্ত পরিবেশে বিদায় নিলেন প্রবীণ ইমাম ও খতিব মাওলানা আব্দুল মালেক লালোপাড়ী।
শুক্রবার (৮ মে) বাদ জুম্মা মসজিদ প্রাঙ্গণে আয়োজিত বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত মানুষের আবেগঘন উপস্থিতি যেন বলে দিচ্ছিল, একজন ইমামের বিদায় মানে শুধু দায়িত্বের অবসান নয়, বরং একটি প্রজন্মের স্মৃতি ও ভালোবাসার অধ্যায়ের সমাপ্তি। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে তিনি দীর্ঘদিনের ইমামতির দায়িত্ব থেকে অবসর নেন।
কিন্তু দায়িত্ব ছেড়ে দিলেও এলাকাবাসীর হৃদয়ে তাঁর অবস্থান যে অটুট থাকবে, সেটিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিদায়ের প্রতিটি মুহূর্তে। গ্রামের প্রবীণ, যুবক, কিশোর ও শিশুরা প্রিয় হুজুরকে একনজর দেখতে ভিড় করেন মসজিদ প্রাঙ্গণে। অনেকেই কান্না লুকাতে পারেননি। দীর্ঘ তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে মাওলানা আব্দুল মালেক লালোপাড়ী শুধু নামাজ পড়াননি, তিনি ছিলেন এলাকার নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধের জীবন্ত প্রতীক। তাঁর কণ্ঠের আজান শুনে বড় হয়েছে বহু প্রজন্ম। তাঁর হাতে কোরআন শিক্ষা নিয়ে আজ অনেকেই দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত।
বিদায়ী বক্তব্য দিতে গিয়ে বারবার আবেগে থেমে যান তিনি। কাঁপা কণ্ঠে বলেন, “আমি চলে গেলেও আমার মন পড়ে থাকবে তোমাদের মাঝেই। তোমরা লেখাপড়া চালিয়ে যাবে, কখনো থেমে যেও না। আল্লাহ যেন সবাইকে কবুল করেন।” তিনি আরও বলেন, “শিশুদের কোরআন শিক্ষার ব্যাপারে আমি কখনো অবহেলা করিনি। প্রয়োজনে নিজেই সকালে তাদের মসজিদে নিয়ে এসেছি। মক্তবগুলোকে আবার প্রাণবন্ত করতে হবে।
প্রতিটি শিশুকে নিয়মিত মক্তবে পাঠাতে হবে।” এ সময় তিনি গ্রামের নারী-পুরুষ, দেশ-বিদেশে থাকা প্রবাসী, অসুস্থ ব্যক্তি এবং কবরবাসী সকলের জন্য দোয়া করেন। দীর্ঘদিন পাশে থেকে সহযোগিতা করায় এলাকাবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তাঁর এক সাবেক ছাত্র বলেন, “অনেক শিক্ষকের কাছে পড়েছি, কিন্তু তাঁর মতো মানুষ খুব কম দেখেছি। তিনি শুধু একজন ইমাম নন, তিনি ছিলেন আমাদের নৈতিকতার শিক্ষক, অভিভাবক ও ছায়ার মতো একজন মানুষ।” অনুষ্ঠানের শেষপর্যায়ে মাওলানা আব্দুল মালেক লালোপাড়ীর সুস্থতা, নেক হায়াত কামনায় বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।
দোয়া শেষে পুরো মসজিদ প্রাঙ্গণে নেমে আসে এক আবেগঘন নীরবতা। এলাকাবাসী জানান, মাওলানা আব্দুল মালেক লালোপাড়ীর দ্বীনি খেদমত, মানবিকতা ও ত্যাগের স্মৃতি তারা আজীবন শ্রদ্ধার সঙ্গে বহন করবেন। উল্লেখ্য, মাওলানা আব্দুল মালেক লালোপাড়ী এর আগে দীর্ঘ ৩০ বছর ৫ মাস পাশ্ববর্তী শীতলজুড়া জামে মসজিদে ইমামতি করেন। পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন ধরে ঐতিহ্যবাহী থানাবাজার লতিফিয়া ফুরকানিয়া দাখিল মাদ্রাসায় দ্বীনি খেদমতে নিয়োজিত রয়েছেন।