বুধবার, ডিসেম্বর ১০ , ২০ ২৫
অধ্যাপক শেখ আব্দুর রশিদ::
১৭ সেপ্টেম্বর ২০ ২৫
৬:৪৫ অপরাহ্ণ

ডাকসু নির্বাচন: সম্ভাবনা সংকটের দোলাচল: অধ্যাপক শেখ আব্দুর রশিদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকাল ১ জুলাই ১৯২১ সালে। বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রাকালে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৮৭৭ জন। গণতান্ত্রিক চর্চার সুযোগ, শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দেওয়া ও বাস্তবায়ন করা, আবাসন, ক্যান্টিন খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মানোন্নয়ন, সর্বোপরি  শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব বিকাশের জন্য গঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। প্রথম ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৩ সালে। এরপর থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত একাধিকবার নির্বাচন হয়। 

ডাকসু আমাদের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, ১৯৯০-এর পর প্রায় ২৮ বছর এই নির্বাচন বন্ধ ছিল। 

২০১৯ সালে নির্বাচন হলেও তা নানা বিতর্ক, প্রশাসনিক পক্ষপাত, ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম, ভোটার তালিকার অসঙ্গতি ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে বিরোধী পক্ষ অংশ নিলেও ফলাফল মেনে নিতে রাজি হয়নি। বয়কট ও বর্জনের সংস্কৃতির মধ্যেই আটকে যায়। ফলে আশার বদলে হতাশাই ভর করে ছাত্রসমাজে। এমনকি সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণও ছিল অত্যন্ত কম। অভিযোগ উঠেছিল—অনেকের ভোট আগেই দিয়ে ফেলা হয়েছে বা ভোট দেওয়ার সুযোগই মেলেনি। ফলে নির্বাচন শেষ হলেও ফলাফলকে স্বীকৃতি দেয়নি বেশিরভাগ পক্ষ।

গণতান্ত্রিক চর্চার ব্যাঘাত-আস্থার সংকট: ডাকসু নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব তৈরি করা। কিন্তু যখন বর্জন ও বয়কট বারবার ঘটে, তখন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা ভোটের পরিবর্তে আন্দোলন, সংঘর্ষ বা বর্জনের পথে হাঁটে।এটি দীর্ঘমেয়াদে ছাত্রসমাজকে গণতন্ত্র থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। ভারতের বা পশ্চিমা দেশগুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলো যেখানে প্রাণবন্ত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, সেখানে বাংলাদেশে “হারলে মানি না” সংস্কৃতি প্রাধান্য পাচ্ছে। আজকের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বিশ্বাস। একপক্ষ অন্য পক্ষের বক্তব্য মানতে নারাজ। প্রশাসনের নিরপেক্ষতার ওপর আস্থাও নষ্ট হয়ে গেছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরাও মনে করে, তাদের ভোটের কোনো মূল্য নেই। এই আস্থাহীনতার কারণে অনেকে ভোটকেন্দ্রে যেতেই চাননি। ফলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠান যখন নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক বা তদন্ত কমিশনের প্রয়োজন দেখা দেয়। ডাকসুর মতো নির্বাচনে জাতিসংঘ, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার পর্যবেক্ষক থাকলে স্বচ্ছতা বাড়তে পারে। এতে বিরোধী পক্ষও কিছুটা আস্থা ফিরে পেতে পারে।

সমাধানের পথ:
ডাকসুকে কার্যকর করতে হলে স্বচ্ছ ভোট প্রক্রিয়া নিশ্চিতে ইলেকট্রনিক ভোটিং সিস্টেম, বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন এবং পর্যবেক্ষকের উপস্থিতি অপরিহার্য। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বাইরে স্বাধীন কমিশনের মাধ্যমে নির্বাচন আয়োজন করা দরকার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ছাত্রসমাজকে বোঝানো—বর্জন নয়, বরং অংশগ্রহণ ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই পরিবর্তন সম্ভব।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে সর্বশেষ ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। অনেক সংগঠন ভোটের আগেই নির্বাচন বর্জন করে। যারা অংশ নিয়েছিল তাদের অনেকে আবার অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তোলে। ফলে ফলাফল ঘোষণার পরও নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থার সংকট দেখা দেয়।এই পরিস্থিতি আবারও প্রমাণ করেছে যে স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত না হলে বর্জন-সংস্কৃতি থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীরা যখন নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে বিশ্বাস করে না, তখন গণতান্ত্রিক চর্চার বদলে হতাশা ও আস্থাহীনতা বেড়ে যায়, যা ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রকে আরও দুর্বল করে তোলে।

ডাকসু নির্বাচন কোনো সাধারণ প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম নয় কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বর্জন ও বয়কটের সংস্কৃতি এই প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে দিয়েছে।স্বচ্ছ প্রক্রিয়া ও আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত না হলে ডাকসু নির্বাচনের ইতিহাস কেবল অনাস্থা ও অবিশ্বাসের গল্পই বলে যাবে।আমাদের অনুরোধ, প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনুসের উপর মানুষের যে আস্থা ও নির্ভরতা রয়েছে—তিনি যেন নিরপেক্ষ পুন:তদন্তের ব্যবস্থা কর ব্যবস্থা করেন। অন্যথায় ভবিষ্যতে তাঁর উপর মানুষের আস্থা ও নির্ভরতা নষ্ট হয়ে বিপরীত ফল সৃষ্টি হতে পারে।

লেখক: বিভাগীয় প্রধান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
লতিফা শফি চৌধুরী মহিলা কলেজ

চেয়ারম্যান : সিলেট সেন্টার ফর  ইনফরমেশন এন্ড ম্যাস মিডিয়া (সিফডিয়া )

ফেইসবুক কমেন্ট অপশন
এই বিভাগের আরো খবর
পুরাতন খবর খুঁজতে নিচে ক্লিক করুন


আমাদের ফেসবুক পেইজ