১০ :৪৮ অপরাহ্ণ
২৪ দিন হাসপাতালের বারান্দায় পরে থাকা অ'জ্ঞাত বৃ'দ্ধাকে ভর্তি করালো সামাজিক সংগঠন 'হৃদয়ে কমলগঞ্জ
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বারান্দায় ধুলা-ময়লা,পোকা-মাকড়ের মাঝে অবহেলা আর অযতনে পড়ে থাকা বৃদ্ধাকে ২৪ দিন পর 'হৃদয়ে কমলগঞ্জ' নামক সামাজিক সংগঠন ও সেচ্ছাসেবীরা হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন।
জানা যায়, বৃদ্ধা মহিলা লিলা বাউড়িকে গত ১১ জুন এক নির্মম রাতে কে বা কারা কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বারান্দায় ফেলে রেখে চলে যায়।
এরপর দীর্ঘ ২৪ দিন রোদ-বৃষ্টি আর অমানবিক কষ্টে বারান্দার এক কোনায় লিলা বাঁচার লড়াই চালিয়ে গেছেন। হাঁটতে পারেন না,ঠিকমত দাঁড়াতেও পারেন না এই বৃদ্ধা। যেখানে শুয়ে ছিলেন, সেখানেই মল-মূত্র ত্যাগ করতে বাধ্য হতেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও দেখেও না দেখার বাহানায় ছিলেন। খাবারের জন্য হাসপাতালের আগত রোগীদের অভিভাবকদের দিকে চেয়ে থাকতেন।
কেউ কলা কেউ পাউরুটি, কেউ এক কাপ চা এটাই ছিল তার জীবন সংগ্রামের বেঁচে থাকার আহার,এ দিয়েই বাঁচার আকুতি ছিল চোখে মুখে।
এই বৃদ্ধার দূর্দশা নজরে পড়ে হৃদয়ে কমলগঞ্জ-এর স্বেচ্ছাসেবক মো. সাইদুল ইসলাম ও সংবাদকর্মী আব্দুল মালিকের এরপর শুরু হয় এক মানবিক সংগ্রাম পরিচয়হীন এই বৃদ্ধাকে বাঁচানোর লড়াই।
অনলাইনে ছবি পোস্ট করে পরিচয় জানার জন্য মাঠে-ঘাটে খোঁজে বেড়িয়েছেন তারা। পাশে এসে দাঁড়ান সমাজকর্মী মো. জুলফিকার আলী সোয়েব, যিনি শিক্ষক হিসেবেই সমাজের পরিচিত। কিন্তু এত চেষ্টা করেও খুঁজে পাওয়া যায়নি তার ছেলে রঞ্জিত বাউড়ি বা স্বজনদের।
তারপরও হাল ছাড়েননি সাইদুল ইসলামসহ বাকিরা। প্রতিদিন দোকান থেকে খাবার এনে খাইয়ে দিয়েছেন। গভীর রাতে এসে কয়েল জ্বালিয়ে দিয়েছেন। যেখানে কেউ দাঁড়াতে চায় না, সেখানে বসে থেকেছেন এই যুবক, যেন এক সন্তান হারিয়ে যাওয়া মায়ের পাশে ছায়া হয়ে থাকে।
গত শুক্রবার (৪ জুলাই) বিকেলে মানবতার ডাকে সাড়া দেন কমলগঞ্জের বাসিন্দা সিলেট ইবনে সিনা হাসপাতালের শিশু, চর্ম ও নাক-কান গলা রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এস. কে. নাহিদ। তিনি লিলাকে দেখে প্রাথমিক চিকিৎসার নির্দেশনা দিয়ে বলেন তাকে দ্রুত ভর্তি করতে হবে। শনিবার (৫ জুলাই) বিকালে "হৃদয়ে কমলগঞ্জ" সংগঠনের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ইয়াকুব আলী হোয়াটসঅ্যাপে একটি মানবিক গ্রুপ তৈরি করেন। সেই গ্রুপে সকল স্বেচ্ছাসেবীদের আলোচনা ও উদ্যোগে লিলাকে গোসল করিয়ে, কাপড় পরিয়ে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করানো হয়। এই উদ্যোগে পাশে ছিলেন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) কমলগঞ্জ শাখার সভাপতি আব্দুস সালাম, হৃদয়ে কমলগঞ্জের সদস্য সোলায়মান উদ্দিন,সংবাদকর্মী আব্দুল মালিক এবং হৃদয়ে কমলগঞ্জের সদস্য সোহান আহমেদসহ বাবলু আহমেদ, জাবেদ আহমেদ, আল আমিন, কামাল আহমেদ, জয়ন্ত দেব ও সিপার উদ্দিন প্রমূখ। আলাপকালে হৃদয়ে কমলগঞ্জ-এর সিনিয়র স্বেচ্ছাসেবক মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, মানবতা আমাদের শিখিয়েছে দায়িত্ব নিতে, আজ এই মা যেন আবার একটু মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারেন, সেটাই আমাদের চাওয়া। কিন্তু এখন আরেকটি চ্যালেঞ্জ, তার চিকিৎসা ও সার্বক্ষণিক দেখাশোনার জন্য একজন নারী সহকারীর ব্যবস্থা করা। আমরা একা পারছি না, আমাদের পাশে দাঁড়ান। এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: মুহম্মদ মাহবুবুল আলম ভূঁইয়া বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে তার খোঁজ রাখছি। হাসপাতালের সকল স্টাফদের বলেছি যেন প্রয়োজন হলে আমাকে অবহিত করে। কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাখন চন্দ্র সূত্রধর বলেন, আমরা তার পরিবারের খোঁজে কাজ করছি, পাশাপাশি সমাজসেবা অধিদপ্তরকে জানিয়েছি যেন প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা যায়।