সোমবার, ফেব্রুয়ারী ১৬, ২০ ২৬
অধ্যাপক শেখ আব্দুর রশিদ::
৪ সেপ্টেম্বর ২০ ২৫
৬:০ ৭ অপরাহ্ণ

বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য: সম্ভাবনার হাতছানি
আজ থেকে প্রায় দুই হাজার তিনশত পঞ্চাশ বছর আগের কথা। সম্রাট আলেকজান্ডার যাকে অনেক ইতিহাসবিদ আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট বলে সম্বোধন করেন। তিনি চেয়েছিলেন পৃথিবীব্যাপী রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। তাঁর শিক্ষাগুরু এরিস্টটল তাকে জানিয়েছিলেন পৃথিবীর শেষ প্রান্ত হচ্ছে ভারত। সারা পৃথিবী জয়ের নেশায় প্রচণ্ড বেগে পশ্চিম থেকে পূর্বের দিকে যুদ্ধ যাত্রা শুরু করেছেন গ্রীক বীর আলেকজান্ডার। ইউরোপ আর এশিয়া মহাদেশের একের পর এক রাজ্য জয় করেন। 

বিখ্যাত ইরান সম্রাট দারায়ুস থেকে শুরু করে উত্তর-পশ্চিম ভারতের পরাক্রমশালী রাজা পুরু পর্যন্ত আলেকজান্ডারের বাহিনীর সামনে দাড়াতে পারে নাই। তাঁর সামনে একটাই বাঁধা ছিল পরাক্রমশালী রাজ্য গঙ্গারিডাই। প্রাচীন গ্রীক পণ্ডিত টলেমির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এখনকার বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে ছিল গঙ্গারিডাইয়ের অবস্থান।  আলেকজান্ডার তাঁর জেনারেলদের নিয়ে গঙ্গারিডাই আক্রমনের জন্য পরিকল্পনা করতে বসেছিলেন। বাংলার পূর্বপুরুষ, এই গঙ্গারিডাইদের চারহাজার হস্তী-বাহিনীর সাথে লড়াই করতে হবে জেনে আলেকজান্ডারের কোন জেনারেলই ভয়ে যুদ্ধ করতে রাজি হলেন না। অগত্যা আলেকজান্ডার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন ত্যাগ করে নিজ দেশে ফিরে যান।

এই বাংলার মানুষই বিশৃংখলা দমনের জন্য তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা দেখিয়ে গণ-নির্বাচনের আয়োজন করে। যে গণ-নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণের সমর্থন নিয়ে রাজা গোপাল রাজ্য ক্ষমতায় আসেন। যা ইতিহাসের প্রথম গণতন্ত্র বলে অভিহিত। গোপালের রাজত্বকাল ছিল ৭৫০ থেকে ৭৭০ খ্রিস্টাব্দ। 

সেই প্রাচীনকাল থেকেই এই বাংলা ছিল অফুরন্ত ধন-সম্পদের দেশ। ধন সম্পদের লোভে আকৃষ্ট হয়ে ইউরোপীয় বণিক সম্প্রদায় এদেশে আসতে শুরু করে। প্রথমে পর্তুগাল, তারপর নেদারল্যান্ড বা হল্যান্ড থেকে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ইংল্যান্ডের ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ডেনমার্ক থেকে ডেনিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ফ্রান্স থেকে ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ইত্যাদি। কোম্পানি গঠন ছাড়াই পর্তুগিজ বণিকগণ বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আসে এবং ১৬২৮ সালে পর্তুগিজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠিত হয়।

 
লর্ড ম্যাকেলে ২ ফেব্রুয়ারি ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বক্তব্যে বলেছিলেন, 'আমি ভারতবর্ষের পূর্ব থেকে পশ্চিম এবং উত্তর থেকে দক্ষিনে ভ্রমন করেছি, কিন্তু কোন ব্যক্তি আমি দেখিনি যে কিনা একজন ভিক্ষুক বা চোর, এমন সম্পদ আমি এ দেশে দেখেছি, এমন নৈতিক মূল্যবোধ, এমন ধীশক্তিসম্পন্ন (চারিত্রিক মূল্যবোধ) মানুষ, আমি মনে করিনা এইদেশকে আমরা পুরোপুরি নতিস্বীকার করাতে পারব। যদি না আমরা তাদের এই মূল্যবোধের মেরুদণ্ড ভেঙে দেই। তাই আমি প্রস্তাব করছি আমরা তাদের পুরোনো এবং প্রাচীন শিক্ষা ব্যবস্থা বদলে ফেলার, তাদের সংস্কৃতি যদি এমন হয় যা কিছু বিদেশী, যা কিছু ইংরেজি ভাষার, তা তাদের যা আছে তা থেকে ভাল তাহলে তারা তাদের আত্মসম্মানবোধ হারাবে এবং তাদের সংস্কৃতির প্রতি হীনমন্য হয়ে পড়বে। তখন আমরা তাদেরকে যেরকম চাই, সেরকম একটি পূর্ণাঙ্গ গোলাম জাতি হয়ে পড়বে । উপরোক্ত বক্তব্য জানা থাকলে হয়তো দেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারনা থেকে বেরিয়ে আসা যেত।  

নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে হারিয়ে পলাশীর প্রান্তরে অনেকটা বিনা যুদ্ধে রবার্ট ক্লাইভ জয়লাভ করেন। ক্ষমতা দখলের প্রথমদিন থেকে যে লুণ্ঠন করে ইতিহাসে তার তুলনা মেলে না। ১৭৬৬ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে একটি 'অনুসন্ধান কমিটি' গঠন করে। কমিটির রিপোর্ট থেকে জানা যায় ১৭৫৭ সাল থেকে ১৭৬৬ সাল পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীরা বাংলা ও বিহার থেকে মোট ৯ কোটি টাকা শুধুমাত্র ঘুষ গ্রহণ করেছিল।

ইংরেজদের নয়া রাজস্বনীতির কারণে কৃষকরা খাজনার টাকা যোগাড় করার তাগিদে সারা বছরের খাদ্য-ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হয়। ইংরেজরা মুনাফা শিকারে সেরা সুযোগরূপে বেছে নেয় চালের মজুদদারীকে। ১৭৬৯ সালে ফসল উঠার সাথে সাথে ইংরেজরা বাংলা ও বিহারের সকল ফসল কিনে - কয়েক গুন বেশি দামে বিক্রির জন্য গোদামজাত করে।ফলে ১৭৭০ সালে (বাংলা ১১৭৬ সালে) শুরু হয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। ব্রিটিশদের সৃষ্ট এই কৃত্রিম দুর্ভিক্ষে কোটি কোটি মানুষ মৃত্যুবরণ করে । তৎকালীন গভর্ণর জেনারেল হেস্টিংস এর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা ছিল এক কোটি  পঞ্চাশ লাখ।

এই সময়ে বাংলার প্রভাবশালী ধনী ব্যাক্তিত্ব হাজী মুহাম্মদ মুহসীন মানুষকে বাঁচাতে অসংখ্য লঙ্গরখানা স্থাপন করেন। তাঁর
মানবিকতার জন্য সে যাত্রায় বাঙ্গালী কিছুটা আশার আলো দেখে। উনার প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের অনেকেই তাকে বলেছিলেন যে, এভাবে দান করলে একসময় সব শেষ হয়ে যাবে। জবাবে হাজী মোহাম্মদ মু্‌হসীন  বলেছিলেন, আমার সম্পদ থাকতে যদি দেশের মানুষ না খেয়ে মারা যায়, তাহলে লানত পড়ুক এই সম্পদের উপর! কত মহান কত মানবিক ছিলেন বাংলার এই ধনকুবের যা আজকের পৃথিবীতে পাওয়া দুষ্কর। অথচ সে সময় কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টিকারী বৃটিশরা এদেশের মানুষ বাঁচাতে একটি টাকাও খরচ করেনি। এভাবে তাদের  শাসন-শোষন চলতে থাকে ১৯০ বছরব্যাপী।
বৃটিশরা ১৯৪৭ সালে এদেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর এই ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৪ বছর পাকিস্তানিদের শোষণের যাঁতাকল থেকে বাঁচতে এদেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে সংগ্রাম  করে। কোটি কোটি মানুষের ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর আমরা চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করি। দীর্ঘদিনের শাসন-শোষণ, নিপীড়ণে পৃথিবীর অন্যতম দরিদ্র দেশে পরিনত হলেও দেশের মানুষের মানবিক অনুভুতিগুলো শেষ হয়ে যায়নি।
গৌরবময় ইতিহাসের আলোকে আজকের দিনে এই হোক আমাদের শপথ- গৌরবোজ্জল অতীতের ন্যায় আবারো উন্নত দেশ হিসেবে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে এই দেশ।

 তথ্য সুত্রঃ বাংলাদেশের রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থা (খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ থেকে ২০০৭ খ্রিস্টাব্দ) অধ্যাপক এস এম জয়নুল আবেদিন। উচ্চমাধ্যমিক পৌরনীতি প্রফেসর মোঃ মোজাম্মেল হক। পৌরনীতি ও সুশাসনঃ জুলফিকার আলী।

লেখক :বিভাগীয় প্রধান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,লতিফা-শফি চৌধুরী মহিলা কলেজ। 
চেয়ারম্যান :সিফডিয়া (সিলেট সেন্টার ফর ইনফরমেশন এন্ড ম্যাস মিডিয়া

ফেইসবুক কমেন্ট অপশন
এই বিভাগের আরো খবর
পুরাতন খবর খুঁজতে নিচে ক্লিক করুন


আমাদের ফেসবুক পেইজ