৩:৫৫ অপরাহ্ণ
শিশুশিক্ষা ও যৌনশিক্ষা
শেখ আব্দুল মজিদ:: শিশু! এই একটা শব্দ আপনার হাজার মন খারাপের শত্রু হতে পারে নিমিষেই। সৃষ্টিকর্তা যদি পৃথিবীতে শিশুদের না পাঠাতেন তবে হয়ত মানুষ হাসতে ভুলে যেত। কিন্তু হায় আমরা এমনই অকৃতজ্ঞ, এই শিশুদেরই আমরা একটা অন্ধকার রংচটা শৈশব উপহার দিচ্ছ ক্রমশ। কয়েকদিন ধরে মাথার ভেতর শুধু এই কথাটাই ঘুরছে।
আমরা যে পৃথিবীটা তাদের থেকে দূরে রাখতে চাই সেই অন্ধকার পৃথিবীটা কিভাবে যেন তাদের স্পর্শ করছে অবিরত। বলছি শিশুদের যৌন নির্যাতনের কথা। যৌনতা কি? যৌন নির্যাতন কি! এই ব্যাপারগুলো আমরা সযত্নে এড়িয়ে যাই শিশুদের কাছ থেকে। যার ফলস্বরূপ শিশুরা বুঝতেই পারে না তারা কখন যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের মতে বাংলাদেশে প্রতি মাসে গড়ে ত্রিশ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়।
ত্রিশ জন? আরও সহজভাবে বললে, প্রতিদিন আপনি যেভাবে চা খান ঠিক তেমনি এ দেশে প্রতিদিন একটা করে শিশু ধর্ষিতা হয়। কালকে রাতে আমাদের দেশে শিশু নির্যাতনের কি অবস্থা জানার জন্য গুগল সার্চ দিলাম এবং যা পেলাম আজ এই লেখায় আমি তারই একটা সারমর্ম দেয়ার চেষ্টা করব। এই তথ্যগুলো অনলাইন থেকে প্রাপ্ত, আমি চেষ্টা করেছি নির্ভুল তথ্য দিতে। তবে এখানে ভুল থাকাটা অস্বাভাবিক নয়।
মূল প্রসঙ্গে আসি, বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের মত ২০১৬ সালে এদেশে বিভিন্ন ধরনের যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৬৮৬ টি শিশু। যার মধ্যে সরাসরি ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৪৬ এবং এই ৪৪৬ জন শিশুর মধ্যে ৬৮ টি শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর থেকে এটা পরিষ্কার যে, এদেশে অধিকাংশ ধর্ষণের শিকার হন অপ্রাপ্তবয়স্করা। হয়ত এভাবেও বলা যেতে পারে, প্রাপ্তবয়স্করা সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে চুপ করে সয়ে যায় এই নির্যাতন।
২০১৫ সালে যেসকল ধর্ষণ হয় তার ৭৫% ছিল শিশু। বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা'র মতে ২০১৭ সালে জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ২৯৪ টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। শুধুমাত্র জুলাই মাসে ৩২ টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এর মধ্যে ৪৬ টি ছিল গণধর্ষণ এবং ২৪ টি শিশু ছিল প্রতিবন্ধী।
কয়েকবছর আগে প্রতিবাদি ফাউন্ডেশন এবং সেভ দ্যা চিলড্রেন যৌথভাবে এক সমীক্ষা চালায়। এই সমীক্ষায় দেখা যায় দেশের ৫০% শিশু, অর্থাৎ দুইজনের একজন কোন না কোন ভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হন। সবচেয়ে খারাপ খবর হচ্ছে, এই যৌন নির্যাতনের ৯১ শতাংশ পরিবারের আত্মীয়দের দ্বারা সংঘটিত হয়। হয়ত আপনি যাকে সবচেয়ে নিরাপদ ভাবছেন আপনার শিশুর জন্য, সেই আপনার বাচ্চার শৈশব অন্ধকার করে দিচ্ছে।
আমি এখানে শিশু বলতে ছেলে এবং মেয়ে উভয় প্রকার শিশুর কথাই বলছি। সেই সাথে সবাইকে একথাটাও মনে করিয়ে দেয়ার প্রয়োজনবোধ করছি, এসব পরিসংখ্যান কিন্তু প্রকাশিত যৌন নির্যাতনের খবরের ভিত্তিতে করা হয়। আর আমাদের দেশের মত একটা রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থায় যৌন নির্যাতনের মত স্পর্শকাতর বিষয় কতখানি লোক চক্ষুর সামনে আসে তা সহজেই অনুমেয়। পাঠক সহজেই হয়ত বাংলাদেশের শিশু যৌন নির্যাতনের বর্তমান পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে পারছেন।
ব্রেকিং দ্যা সাইলেন্স - নামক সংস্থাটি আপনাদের জন্য কাজটা আরও সহজ করে দিয়েছে। চোখ বন্ধ করুন এবং আপনার আশেপাশে থাকা ১০ জন মেয়ে শিশুর নাম ঠিক করুন। এবার জানবেন এই দশ জনের ৭ জনই কোন না কোন ভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার। এই সাত জন শিশুর মধ্যে আপনার সন্তান, বোন, ভাতিজি, ভাগনি যে কেউ থাকতে পারে। মেয়ে শিশুর যৌন নির্যাতনের হার ছেলেদের চেয়ে বেশি। কিন্তু ছেলে শিশুরাও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়।
একবার চিন্তা করুন যেই শিশুটা যৌন নির্যাতনের শিকার হল সে তার বাকিটা জীবন শৈশব বলতে এই অন্ধকার অংশটুকুকেই ভাববে। এর ফলে ঐ শিশুটির পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশ ঘটা সম্ভব নয়। এই যে কয়েকদিন আগে ৭ বছরের একটা শিশুকে ধর্ষণের পর খুন করা হল কিংবা তারও আগে পূজা নামের যে মেয়েটাকে ধর্ষণ করা হল, এভাবে বলতে গেলে হাজারটা নাম বলা যাবে। এসব ধর্ষণের ঘটনার পর সবাই প্রতিবাদী হয়ে ওঠে অপরাধীর শাস্তির দাবিতে।
সোচ্চার হয়ে ওঠে আইন ব্যবস্থার ভুলত্রুটি নিয়ে। কিন্তু যে শিশুটা নির্যাতনের শিকার হল, যে শিশুটা মারা গেল তারা কি আর তাদের আগের অবস্থায় ফিরে যায়। কখনও? কোনদিন? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোন নির্যাতিত শিশুকে তার আগের শৈশব ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব নয় বলেই আমি মনে করি। তাই সরকার, সমাজ ব্যবস্থা আম, জাম কাঁঠালের দোহাই না দিয়ে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা শ্রেয়। যেহেতু ধর্ষক পশুরা দেখতে আমাদের মতই তাই বেছে বেছে তাদের বের করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। বাগানে বেড়াতে গেলে আমরা যেমন বাচ্চাদের ফুলের সাথে সাথে কাটার সাথেও পরিচয় করিয়ে দেই।
ফুল আর আগাছার মাঝে পার্থক্য করা শিখাই ঠিক তেমনি এই সমাজে আমাদের শিশুদের নিরাপদ রাখতে হলে মানুষরূপী পশু কি-তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। বাচ্চাদের শিখাতে হবে তাদের শরীরের স্পর্শকাতর জায়গা কোনগুলো, তাদের এটা বোঝাতে হবে এই সব জায়গায় কারো স্পর্শ করার অধিকার নেই। কেউ যদি এরকম কিছু করতে চায় তবে সে খারাপ। সেই সাথে বাচ্চাদের মনের কথা বলার জায়গা করে দিতে হবে।
বাবা মা, বড় ভাই বোন শিক্ষক সবার সাথেই বাচ্চাদের এমন একটা সম্পর্ক তৈরি করতে হবে যেখানে বাচ্চারা তাদের কথা মন খুলে বলতে পারে। বাচ্চাদের এই আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদের। আমাদের দেশে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির প্রধান কারণ হলো, আমরা আমাদের শিশুদের সঠিক যৌন শিক্ষা দেই না। যার ফলে তারা নিজে নির্যাতিত হলে যেমন প্রতিবাদ করতে পারে না। তেমনি সঠিক যৌন শিক্ষার অভাবে নিজেই একসময় ধর্ষক হয়ে ওঠে।
আমাদের দেশে যৌন নির্যাতন যে হারে বাড়ছে তাতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি দরকার জন সচেতনতা। আর এই সচেতনতা সরকার বা সামাজিক সংগঠনের বা বাবা মায়ের উপর ছেড়ে দিলে শুধু হবে না। এই শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ তাই তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বও আমাদের সবার। আমরা যদি শিশুদের একে অন্যকে সম্মান করা শিখাই তবে একটা সময় পর এই সমাজ থেকে মানুষরূপী পশুদের বিলুপ্তি ঘটবে।
আমরা সবাই যদি একটু সচেতন হই তবে শিশু যৌন নির্যাতনের হার কমিয়ে আনা খুব বড় ব্যাপার নয়। আমার মতে এর জন্য ছোট দুইটা কাজই যথেষ্ট। এক. আইন ব্যবস্থাকে এতটাই শক্তিশালী করা যে ধর্ষকের যেন সাথে সাথে শাস্তি প্রদান করা হয়। কিছু দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারলে যাদের মনে ধর্ষক মনোভাব আছে তারা এমনিতেই বিলীন হয়ে যাবে। দুই. আমরা প্রত্যেকে আমাদের আশেপাশে থাকা পরিচিত শিশুদের যদি যৌন নির্যাতন সম্পর্কে খানিকটা ধারনা দেই, তাদের অভিভাবকদের যদি বোঝাই কেন শিশুদের যৌন নির্যাতন সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়োজন, কেন অভিভাবক আর শিশুদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন, তবে এই ভয়ংকর পরিস্থিতি পাল্টাতে খুব বেশি দিন সময় লাগবে না।
এক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় যৌন শিক্ষা প্রদান সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। একই সাথে শিক্ষকরা এবং তরুণরা দারুণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আমি মনে করি। আমি আমার আশেপাশের শিশুদের এবং তাদের অভিভাবকদের যৌন নির্যাতন সম্পর্কে সচেতন করার চেষ্টা করব। আপনিও চেষ্টা করা শুরু করুন। দিন পালটাবে, আমরা সবাই মিলে নতুন দিন আনব। আমাদের চেষ্টাই শিশুদের অন্ধকার নয়, বরং আলো ঝলমলে শৈশব এনে দেবে। লেখক: শেখ আব্দুল মজিদ সাংবাদিক ও কলামিস্ট