৫:৫৬ অপরাহ্ণ
বুড়িকিয়ারি বাঁধ পরিদর্শনে জনপ্রতিনিধি ও প্রকৌশলীরা
কুলাউড়াসহ তিন উপজেলায় দীর্ঘস্থায়ী বন্যা
দীর্ঘদিন থেকে খনন কাজ না হওয়ায় ভরাট হয়ে গেছে কুশিয়ারা, মৌলভীবাজারের জুড়ী, ফানাই-আনফানাই নদী। স্রোতের তোড়ে নদীর পলিমাটি পড়ছে হাওরগুলোতে। নদীর তলদেশ ভরাট হওয়ার পাশাপাশি হাওরে পানি ধারণের ক্ষমতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। অন্যদিকে বৃষ্টির পানির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে উজান থেকে নেমে আসা মাত্রাতিরিক্ত পাহাড়ি ঢল।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলায় দীর্ঘস্থায়ী বন্যার পেছনে প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট দুটি কারণের কথাও বলছেন বিশেষজ্ঞ মহল ও পানিবন্দি লোকজন। তাছাড়া সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার বুড়িকিয়ারিতে তৈরি বাঁধ ও ইটভাটা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অবহেলা ও গাফিলতিকে তারা দায়ী করেছেন।
পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখায় ২০১৮ ও ২০২২ সালে যে বন্যা হয়েছিল এবং এ বছর যে বন্যা শুরু হয়েছে, তা স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা। মৌলভীবাজারের তিন উপজেলার প্রায় দুই লাখ মানুষ এখনো পানিবন্দি। ২০০৪ সালে এ রকম বন্যা হলেও তা অঞ্চলভেদে ১৫-২০ দিন স্থায়ী ছিল।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, কুশিয়ারা নদী সিলেটের গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ উপজেলা হয়ে মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের উপর দিয়ে বয়ে গেছে। একইভাবে ভারতের ত্রিপুরা অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত জুড়ী নদী মৌলভীবাজারের জুড়ী ও কুলাউড়ার উপর দিয়ে হাকালুকি হাওর হয়ে সিলেটে ঢুকেছে।
তাই ভারতীয় অংশে সামান্য বৃষ্টিপাত হলেই এসব নদীর মাধ্যমে পানি গড়িয়ে আসে। পাউবো জানায়, ভারতীয় অংশে মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে যৌথ নদীগুলো দিয়ে পানি বাংলাদেশে ঢুকে। অথচ হাওরাঞ্চলে আগে থেকেই বন্যা সৃষ্টি হওয়ায় পুরনো পানি স্থিতিশীল অবস্থায় ছিল। পাউবো বলছে, প্রায় ২১০ কিলোমিটার দীর্ঘ কুশিয়ারা নদীর ১২০ কিলোমিটার পড়েছে সিলেট বিভাগে।
এ নদীতে খুব বেশি চর না পড়লেও গভীরতা অনেকটাই কমে এসেছে। নদীটির অন্তত ৩৫-৪০ কিলোমিটার অংশ দুই দেশের আওতাধীন থাকায় একাধিকবার খননের উদ্যোগ শুরু করেও শেষ পর্যন্ত নানা কারণে সফল হয়নি। নাব্যতা-সংকটের পাশাপাশি তিনটি বিষয় বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার জন্য দায়ী করা হয়। কুশিয়ারা নদীর যেসব স্থানে বাঁধ রয়েছে, সেগুলো যদি সংস্কারের পাশাপাশি নতুন বাঁধ নির্মাণ করা যেত, তাহলে বন্যার ভয়াবহতা এতটা বাড়ত না।
মৌলভীবাজারে কুলাউড়া পৌরসভাসহ কয়েকটি ইউনিয়ন, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার হাওর-সংলগ্ন গ্রামগুলো পানিতে ভাসছে। বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন অনেকে। রাস্তাঘাট ডুবে থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এই তিন উপজেলায় দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি। এই দীর্ঘ সময়ে বন্যার জন্য অতি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পাশাপাশি হাকালুকি হাওর, জুড়ী ও কুশিয়ারা নদী ভরাট হয়ে যাওয়া, জুড়ী ও কুশিয়ারা নদীর সংযোগস্থল সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের বুড়িকিয়ারিতে তৈরি একটি ক্রসবাঁধ এবং সেখানে নির্মিত একাধিক ইটভাটাকে দায়ী করা হচ্ছে।
জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, পরিবেশবিদের সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য পাওয়া গেছে। কুলাউড়া পৌরসভার মেয়র অধ্যক্ষ সিপার উদ্দিন আহমদের উদ্যোগে ১৩ জুলাই শনিবার বন্যার কারণ চিহ্নিত করতে বুড়িকিয়ারি বাঁধ পরিদর্শন করেন উপজেলা চেয়ারম্যান, মেয়র, পৌরসভার প্রকৌশলী ও সাংবাদিকরা।
পরিদর্শন শেষে কুলাউড়া পৌরসভার মেয়র অধ্যক্ষ সিপার উদ্দিন আহমদ বলেন, 'প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর আয়তনের হাকালুকি হাওরকে ঘিরে আছে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা এবং সিলেটের গোলাপগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা। হাকালুকি ও কুশিয়ারা নদীর সংযোগস্থল ফেঞ্চুগঞ্জ বাজার-সংলগ্ন বুড়িকিয়ারিতে পাউবো ২০০৬ সালে একটি বাঁধ নির্মাণ করে। এই ক্রসবাঁধের কারণে হাকালুকি হাওরে দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।
তাছাড়া এই এলাকায় একাধিক ইটভাটা নির্মাণ করা হয়েছে, যার কারণে হাওরের পানি নিষ্কাশনে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া হাকালুকি হাওরের পানি জুড়ী নদী হয়ে কুশিয়ারায় গিয়ে পড়ে। কিন্তু জুড়ী ও কুশিয়ারা নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি হাওর থেকে বেরোতে পারছে না। এনিয়ে উধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে বিষযটি অবগত করবো ও দীর্ঘ জলাবদ্ধতার নিরসনে কাজ করে যাব।'
কুলাউড়া উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলুল হক খান সাহেদ বলেন, 'আগে হাকালুকি হাওর অনেক গভীর ছিল। অনবরত বৃষ্টি হলেও এভাবে বন্যা হত না। এখন দুই ঘণ্টা বৃষ্টি হলেই পানিতে ভরে যায়। এছাড়া বুড়িকিয়ারির বাঁধ একটা মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। কুশিয়ারার মুখে ইটভাটা দিয়ে পানির গতি বাধাগ্রস্তসহ আরোও কিছু সমস্যা চিহ্নিতকরণ করা হয়েছে। এলাকাবাসী বার বার বন্যার স্হায়ী সমাধানের জন্য বিভিন্নভাবে দাবি জানিয়ে সমস্যার সমাধান পাননি।'