৭:০ ৪ অপরাহ্ণ
শিশুর প্রতি মানবিক হোন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদে বাঁচতে দিন
শেখ আব্দুল মজিদ:: শিশুদের ভালবাসে না- এমন মমতাহীন মানুষ খুব কমই রয়েছে। তারপরও কবি-সাহিত্যিকরা তাদের লেখায় বারবার শিশু অধিকার ও তাদের প্রতি কী দায়িত্ব পালন করতে হবে তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে যেভাবে শিশুর প্রতি অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে, কবি ও সাহিত্যিকদের এসব লেখা যথার্থ হয়ে উঠছে। সাধারণত কবি ও সাহিত্যিকদের অনেকটা ভবিষ্যৎদ্রষ্টা হতে হয়।
আজ থেকে একশ বছর পর কী হবে বা হতে পারে, বর্তমানের উপর দাঁড়িয়ে তা বিবৃত করা দূরদৃষ্টি দিয়ে তাদের দেখতে হয়। এসব লেখাই কালজয়ী হয়ে উঠে। আবার কেউ কেউ মানুষ ও মানবিকতার প্রতি সবসময় দরদী হয়ে থাকার আহ্বানও জানান। মানবসভ্যতাকে এগিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়াই হচ্ছে, শিশুর জন্ম। শিশুর জন্ম না হওয়া মানে মানবসভ্যতা থেমে যাওয়া। অথচ এই সভ্যতার ধারাবাহিকতা যেন আমাদের দেশের কিছু নরপশুরূপী মানুষ থামিয়ে দিতে চাইছে। তারা শিশুর প্রতি এতটাই অমানবিক হয়ে উঠছে যা দেখে মায়া-মমতাসম্পন্ন সভ্য মানুষকে শিউরে উঠতে হয়।
ইতোমধ্যে আমরা কিছু নিষ্ঠুর ঘটনা অবলোকন করেছি। এসব ঘটনা সবারই জানা। আলোচিত এসব ঘটনা যে নীরবে-নিভৃতে ঘটে যাওয়া অনালোচিত শিশু নির্যাতনের মুখ হয়ে উঠেছে, তা বলা বাহুল্য। খুব বেশি আগে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। শিশু নির্যাতন ও নির্মূল করার ঘটনা যে কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে তা গত বছর ও এ বছরের চার মাসের চিত্র দেখেই বোঝা যায়। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম ২০১৫ ও এ বছরের প্রথম চার মাসে শিশু নির্যাতনের একটি প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রকাশ করেছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, গত বছর ৭২৭ শিশু ধর্ষণ ও ২৯২ শিশু হত্যাকা-ের শিকার হয়েছে।
এ বছরের প্রথম ৪ মাসে ধর্ষিত হয়েছে ১৩৮ এবং খুন করা হয়েছে ৯৫ শিশুকে। এ হার উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে। এর অর্থ হচ্ছে, নরপশুরূপী কিছু মানুষ মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রার ধারক-বাহক এবং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যেন রুখে দিতে চাইছে। এই পশুসদৃশ মানুষকে কোনভাবেই যেন নিবৃত করা যাচ্ছে না। মাংসাশী পশু যেমন তার চেয়ে দুর্বল প্রজাতিকে আহার হিসেবে শিকার করে, ঠিক তেমনি কিছু নরপশু সমাজের সবচেয়ে দুর্বল শ্রেণীর উপর তাদের জিঘাংসা চরিতার্থ করে চলেছে। ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশুকে লোমহর্ষক পন্থায় মেরে ফেলছে। কেবল খুন-ধর্ষণের শিকার বাবা-মায়ের হাহাকারের চিত্র আমরা অহরহ দেখছি। নরপশুদের বিচার দেখছি না। ঘাতকরা সমাজের রীতিনীতি-নৈতিকতা এবং মানবিকতাকে যে পদদলিত করে চলেছে এ নিয়ে সামাজিক প্রতিরোধ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও তেমন কোনো কার্যকারিতা পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
ফলে শিশু নিধন চলছে এবং বাবা-মায়ের বুক খালি হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে ধরে নেয়া হয়, শিশুর অভিভাবক শুধু তার মা-বাবাই নন, সমাজের সকলেই তার অভিভাবক। প্রত্যেক শিশুকেই তার নিজের সন্তান হিসেবে গণ্য করা হয়। এই মূল্যবোধ যেন ক্ষয়ে যাচ্ছে। তা না হলে চিলের মতো ছোঁ মেরে নিয়ে কিভাবে শিশুদের প্রাণ হরণ করা হয়! কেন এই চিলকে আমরা প্রতিরোধ করতে পারছি না? শিশু নির্যাতন ও খুন-ধর্ষণের এই চিত্রের পাশাপাশি আমরা বাবা-মা কর্তৃক সন্তানের প্রতি উদাসীনতার আরেকটি চিত্রও বেশ উদ্বেগজনকভাবে লক্ষ্য করছি।
শিশু নির্যাতন ও হত্যার বিষয়টি আমরা কতজন নিজের সন্তানের দিকে তাকিয়ে উপলব্ধি করি, এ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশের অবকাশ রয়েছে। শিশু নির্যাতন বা হত্যার বিষয়টিকে কেউ বড় করেও দেখছে না। শিশুরা ছোট বলে চোখে পড়ছে না বা শিশু হত্যা করলে তেমন কোনো ক্ষতি নেই- এমন মানসিকতা প্রতীয়মাণ হচ্ছে। এ ধরনের সিডেটিভ মাইন্ড বা অবশ হয়ে পড়া মানসিকতা খুব বেশি চোখে পড়ছে। এমনকি যে নরপশু আরেক জনের সন্তানকে নির্যাতন ও হত্যা করার সময় নিজের সন্তানে বা ছোট ভাইবোনের কথা একবারের জন্যও মনে করে না।
এ ধরনের মানবিক গুণাবলীশূন্য নরপশুদের ধরে যদি দ্রুত শাস্তি এবং একের পর এক শাস্তি দেয়ার নজির সৃষ্টি করা না যায়- তবে শিশু নির্যাতন ও হত্যা কোনভাবেই বন্ধ করা যাবে না। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সর্বাধিক। কারণ শিশুরাই একদিন রাষ্ট্রের হাল ধরবে। সমাজ ও পরিবারের অভিভাবকদেরও রাষ্ট্রের আগে দায়িত্ব পালন করতে হবে। উপলব্ধি করতে হবে সন্তানের চেয়ে পৃথিবীতে মূল্যবান আর কিছু নেই। এই মূল্যবান ধন তাদেরই যক্ষের মতো আগলে রাখতে হবে। তাদের যথাযথ যতœ নিতে হবে। সুষমভাবে গড়ে তোলার জন্য পারিবারিক মূল্যবোধ, নীতিনৈতিকতা এবং নিয়মানুবর্তিতার বন্ধনে আবদ্ধ করতে হবে।
কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাব ও মোবইল, অনেক রাতে ঘুমাতে যাওয়া, খুব সকালে ঘুমকাতুরে চোখে সন্তানকে উঠিয়ে অনেকটা টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার জীবন চক্র থেকে বের হয়ে আসতে হবে। বুঝতে হবে সন্তানের সাময়িক বিনোদন এবং আধুনিকতার প্রতিযোগিতায় শামিল করতে গিয়ে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ঠেলা দেয়া হচ্ছে। সবচেয়ে জরুরি বিষয় শিশুদের সুরক্ষায় আমাদের প্রত্যেকের মানবিকবোধ সদা জাগ্রত রেখে রক্ষাব্যূহ গড়ে তুলতে হবে। যেখানেই শিশু নির্যাতন হয় সেখানেই প্রতিরোধ ও প্রতিবাদ করতে হবে। শিশুদের সঠিকভাবে গড়ে তোলার আমাদের যে চিরায়ত মূল্যবোধসম্পন্ন রীতি রয়েছে তা অনুসরনে মনোযোগী হতে হবে।
সম্প্রতি একটি পত্রিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে- কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাব, মোবাইল ফোন, টেলিভিশনের আসক্তির কারণে শিশুরা দৃষ্টিশক্তি হারাচ্ছে। সময়ের আগেই তাদের চোখে মাইনাস পাওয়ারের চশমা উঠছে। দীর্ঘ সময় চোখের সামনে রেখে শিশুদের কম্পিউটার, ট্যাব বা মোবাইলে গেমস খেলার কারণে তাদের দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পাচ্ছে। জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হাসপাতালটিতে মাসে ৩ হাজার ৭০০ শিশু আসে। এদের ৭০ শতাংশ দূরের জিনিস দেখতে পায় না। এর অধিকাংশ কারণ শিশুদের কম্পিউটার, ট্যাব ও মোবাইলে দীর্ঘ সময় ধরে একদৃষ্টিতে গেমস খেলা। চক্ষু বিষেশজ্ঞরা একে অত্যন্ত ‘অ্যালার্মিং’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
এমন ধারণা পোষণ অমূলক হবে না, অভিভাবকরা যেন জেনেবুঝে একটি ক্ষীণ দৃষ্টিসম্পন্ন ও অন্ধ প্রজন্ম সৃষ্টি করে চলেছে। শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ এবং সুস্থ ও শক্তিশালী প্রজন্ম গড়ে তোলার বিষয়টি উপেক্ষা করে চলেছে। একদিকে দুর্বৃত্ত কর্তৃক শিশুদের নির্যাতন অন্যদিকে অভিভাবকদের অসচেতনতা- এই উভয় সংকটে পড়ে শিশুরা এক চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, শিশুদের দিকে অভিভাবকসহ সমাজের সচেতন শ্রেণীর তেমন কোনো নজর নেই। এক ধরনের অবহেলা ও উদাসীনতা তাদের মধ্যে কাজ করছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের যে সঠিক যত্ন নেয়া ও গড়ে তোলা প্রয়োজন, এ বোধ যথাযথভাবে কাজ করছে না। যদি করতো তাহলে শিশুদের প্রতি নির্মম আচরণ হতো না।
শিশু নির্যাতনের পরিসংখ্যানও এতো ভয়াবহ হতো না। বলাবাহুল্য, বাইরের দুর্বৃত্ত শ্রেণীর নিষ্ঠুরতা থেকে অভিভাবকরা যেমন তার সন্তানকে রক্ষা করতে পারছেন না, তেমনি ঘরের ভেতরও তাদের ক্ষতি হয় এমন কাজ থেকে বিরত রাখতে পারছেন না। তবে এ কথা মানতেই হবে, অভিভাবকদের এমন আচরণের অন্যতম কারণ নিরাপত্তা। সন্তানকে ঘরের বাইরে পাঠিয়ে যে তারা নিরাপদবোধ করবেন, এ নিশ্চয়তা তারা পাচ্ছেন না। খেলাধুলার জন্য ঘরের বাইরে পাঠানোর মতো নিরাপত্তা এখন নেই বললেই চলে। এর উপর পর্যাপ্ত মাঠ এবং উন্মুক্ত জায়গারও অভাব রয়েছে। বিনোদনের জন্য সন্তানদের নিয়ে বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে সন্তানদের অনেকটা ঘরবন্দি করে রাখতে হচ্ছে।
তাদের হাতে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাব, মোবাইল তুলে দিতে হচ্ছে। এভাবেই শিশুদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বীজ বপিত হচ্ছে। একনাগাড়ে গেমস খেলতে গিয়ে তারা দৃষ্টিশক্তি হারাচ্ছে আবার কোনো ধরনের নড়াচড়া না করায় তাদের শারীরিক সক্ষমতাও হ্রাস পাচ্ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, শহরের শিশুদের শতকরা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ স্থূল হয়ে পড়ছে। এর মূল কারণ তাদের খেলাধুলার সুযোগ না থাকা। স্থ’ূলাকৃতি হওয়ার এই প্রবণতায় শিশুরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে শহরের কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাব ও মোবাইলের মাধ্যমে শিশুদের দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের সমস্যা। চিকিৎসকরা এই সমস্যাকে ‘কম্পিউটার ভিশন সিনড্রম’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
এ রোগে শিশুদের দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে পড়ে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে ‘মাইয়োপিয়া’ বলা হয়। এতে শিশুরা চোখে ঝাপসা দেখা, চোখ পিটপিট করা ও মাথাব্যথায় আক্রান্ত হয়। চিকিৎসকরা বলেন, শিশুরা যখন খুব কাছ থেকে এসব যন্ত্র ব্যবহার করে তখন চোখের মণি এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকে। চোখের পাতা পড়ে না। পাতা পড়লেও চোখের ভেতরের পানি চোখের মণিকে আর্দ্র করে ফেলে। পাতা না ফেললে কর্ণিয়ার যে পানি তা বাতাসে মিলিয়ে যায়।
এই পানির অভাবে শিশুরা অনবরত চোখ পিটপিট করে। তাদের দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পেতে শুরু করে। এজন্য চিকিৎসকরা বলেন, দৃষ্টিকে একদিকে নিবদ্ধ রাখলে হবে না। দূরে তাকাতে হবে। আগের দিনে দাদি-নানিরা দূরের দিকে তাকিয়ে সবুজ দেখতে বলতেন। এর কারণ দৃষ্টি প্রসারিত করা এবং চোখের বিশ্রাম দেয়া। এতে চোখের ব্যায়াম হয়, দৃষ্টিশক্তিও স্বাভাবিক থাকে। এ সময়ে এসে বাবা-মায়েরা এ বিষয়গুলো বেমালুম হয়ে গেছেন।