সোমবার, জানুয়ারী ২৬, ২০ ২৬
সহ:অধ্যাপক শেখ আব্দুর রশিদ::
২ অক্টোবর ২০ ২৫
৭:৫৪ অপরাহ্ণ

তথ্য প্রযুক্তির মহাবিপ্লব: ঘুচে গেল প্রজন্ম পার্থক্য

মকবুল সাহেব, একজন অবসরপ্রাপ্ত ভদ্রলোক, বয়স ৬৬। একসময় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন নিয়মিত। নাতি-নাতনিদের সঙ্গে খেলায় আনন্দ খুঁজতেন। যখন প্রথম স্মার্টফোন হাতে আসার পর বদলে গেলো তার জীবনযাত্রার হালচাল। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব—এসবের ভিড়ে সময়ের হিসাব হারিয়ে গেল। নামাজে অনিয়ম, শরীর খারাপ, নাতি-নাতনিদের সঙ্গে দূরত্ব—সব মিলিয়ে তার জীবনতরীর গতিপথ পাল্টে গেল।

অন্যদিকে ছোট্ট একটি শিশু। এখনও ঠিকঠাক বসতে শেখেনি, শুধু শুয়ে থাকতে পারে। কান্না করলে শান্ত রাখার সহজ উপায় হলো হাতে  মোবাইল ফোন ধরিয়ে দেওয়া। রঙিন ভিডিও দেখলেই চুপ হয়ে যায়। কিন্তু ফোন বেজে উঠতেই মা এসে ফোনটা নিলেন। মুহূর্তেই শিশু ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠলো।

এই দুই দৃশ্যই আজকের সমাজের প্রতিচ্ছবি। শিশু থেকে বৃদ্ধ, তরুণ থেকে তরুণী—সবাই একই সূত্রে বাঁধা। আগে প্রজন্মভেদে পার্থক্য ছিল, ছোটরা ভুল করলে বড়রা সংশোধন করতো। এখন বড়রাই আসক্ত হলে 

প্রজন্মের লাইটহাউজ হবে কে?  এমন এক সময়, যেখানে সবাই একাকার—সবাই এখন স্মার্টফোন প্রজন্ম। আসক্তির বৃত্তে সব বয়স। 

আগে মনে করা হতো প্রযুক্তি তরুণদের ব্যাপার। এখন দেখা যাচ্ছে, বয়স্করা ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপে ব্যস্ত, আর শিশুদের শান্ত রাখার সহজ উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ইউটিউবের কার্টুন। তরুণরা তো আছেই, প্রায় সারাক্ষণ অনলাইনে।এ যেন এক অদৃশ্য বৃত্ত। ভেতরে ঢুকলে আর বের হওয়া কঠিন। শিশুরা ভিডিও ছাড়া খেতে চায় না,তরুণরা নোটিফিকেশন ছাড়া পড়তে পারে না, আর বয়স্করা ফেসবুক ছাড়া নিঃসঙ্গতা কাটাতে পারেন না। বয়সের সীমা পেরিয়ে সবাই একই অভ্যাসে বাঁধা।

ঘুচে গেল প্রজন্ম পার্থক্য:

একসময় পরিবারে বয়স্করা ছিলেন দিকনির্দেশক। তরুণরা সময় নষ্ট করলে বাবা-মা বা দাদা-দাদি কঠিনভাবে সতর্ক করতেন। এখন উল্টো পরিস্থিতি—তরুণরা যেমন ফেসবুকে ডুবে আছে, তেমনি দাদা-দাদিও সেই একই কাজে ব্যস্ত। ফলে পরিবারে আর কেউ কাউকে আটকাতে পারছে না। সবাই একই ভুল করছে, সবাই একই জগতে ডুবে আছে।প্রজন্মের ফারাক মুছে গিয়ে তৈরি হয়েছে “ভার্চুয়াল প্রজন্ম”—যেখানে বাস্তব যোগাযোগের জায়গা দখল করেছে মোবাইলের স্ক্রিন।

বাস্তব হারিয়ে ভার্চুয়ালে:

একসাথে বসে খাওয়া হলেও সবার হাতে থাকে ফোন। কথা বলার বদলে সবাই স্ক্রল করে চলেছে।নাতি-নাতনি দাদুর কাছে গল্প শোনার বদলে খুঁজছে ইউটিউবে কার্টুন। তরুণেরা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় বসেও মেসেঞ্জারে ব্যস্ত।এতে সম্পর্ক দুর্বল হচ্ছে। পরিবার ও বন্ধুদের মধ্যে যে উষ্ণতা ছিল, তা হারিয়ে যাচ্ছে। একসময় সন্ধ্যা কাটতো হাসি-আড্ডায়, আজ সেখানে নীরবতা—শুধু স্ক্রিনের আলো।

শারীরিক ও মানসিক প্রভাব:

দীর্ঘসময় স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার কারণে চোখে ব্যথা, ঝাপসা দেখা, মাথাব্যথা হয়। নীল আলো ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়, ফলে রাত জাগা অভ্যাসে পরিণত হয়।খেলা বা হাঁটার বদলে সবাই বসে ফোনে ডুবে থাকে। এতে স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, নগরীর তরুণদের মধ্যে স্থূলতার হার ২১%, যার প্রধান কারণ অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম।বারবার নোটিফিকেশন পড়াশোনা বা কাজে মনোযোগ ভেঙে দেয়। একটানা বই পড়া বা গভীরভাবে চিন্তা করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ২০২২ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫–২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার উদ্বেগ ও হতাশার অন্যতম কারণ। বাংলাদেশেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

মানসিক স্বাস্থ্য সংকট:

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন আনন্দ দেয়, তেমনি তুলনার ফাঁদও তৈরি করে। অন্যের সাজানো ছবি দেখে নিজের জীবনকে ছোট মনে হয়। এতে আত্মসম্মান কমে যায়, হতাশা বাড়ে।তরুণদের মধ্যে বিশেষভাবে বাড়ছে FOMO (Fear of Missing Out)—কেউ কিছু শেয়ার করেছে, আমি যেন মিস না করি, তাই বারবার ফোন চেক করা। এতে মন সবসময় অস্থির থাকে।আরও আছে সাইবার বুলিং।অনলাইনে হেয়প্রতিপন্ন মন্তব্য বা কটূক্তি তরুণদের মানসিকভাবে দুর্বল করে। অনেকে বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার বদলে ভার্চুয়াল জগতে আশ্রয় নেয়। এতে সমস্যা সমাধান হয় না, বরং জটিল হয়ে যায়।

গাইড দেবে কে, সবাই তো আসক্ত সবচেয়ে বড় সংকট হলো দিকনির্দেশনার অভাব। আগে বাবা-মা সন্তানকে বলতেন, “ফোনটা রেখে পড়াশোনায় বসো।” এখন সেই বাবা-মাই ফোনে ব্যস্ত। দাদু বলতেন, “নাতি, বাইরে খেলতে যা।” এখন সেই দাদুই ফেসবুকের পোস্টে ডুবে আছেন।যখন শিক্ষক, অভিভাবক, এমনকি সমাজের নেতৃত্বস্থানীয়রাও আসক্তির মধ্যে পড়ে যান, তখন তরুণদের নিয়ন্ত্রণে রাখার কেউ থাকে না। সবাই একই স্রোতে ভেসে যায়।

সমাধান ও করণীয়:

সমস্যা আছে, কিন্তু সমাধানও সম্ভব। প্রতিদিন কিছু সময় ফোন ছাড়া কাটানো। যেমন, খাওয়ার সময় বা ঘুমানোর আগে ফোন বন্ধ রাখা।প্রতিটি অ্যাপে কত সময় কাটানো যাবে সেটার সীমা নির্ধারণ, কিন্তু স্ক্রিনটাইম নিয়ন্ত্রণ,বাস্তব সম্পর্ক তৈরি করা, পরিবারের সঙ্গে আড্ডা, একসাথে হাঁটা, বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করা, খেলাধুলা, বই পড়া, গান বা আঁকাআঁকি মানসিক চাপ কমায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতা,স্কুল-কলেজে সামাজিক মাধ্যমের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক নিয়ে আলোচনা করা।তাছাড়া-মানসিক স্বাস্থ্যসেবা উদ্বেগ বা হতাশা বাড়লে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া।শিশুদের হাতে ফোন না দিয়ে বিকল্প খেলাধুলার ব্যবস্থা করা।

প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অংশ, একে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। তবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে আশীর্বাদের বদলে অভিশাপে পরিণত হয়। আজ শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই একই অভ্যাসে বাঁধা—একই স্ক্রিনে ডুবে থাকা। এর ফলে প্রজন্মের পার্থক্য মুছে গিয়ে তৈরি হয়েছে এক নতুন প্রজন্ম—স্মার্টফোন প্রজন্ম।ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক পথে রাখতে হলে এখনই সচেতন হতে হবে। ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার, বাস্তব সম্পর্কের গুরুত্ব আর পরিবারের সক্রিয় ভূমিকা,এই সমস্যার সমাধানে সহায়ক হতে পারে। নাহলে যে প্রজন্ম একসময় দিকনির্দেশনা দিতো, তারা নিজেরাই দিশাহীন হয়ে পড়বে।

লেখক: বিভাগীয় প্রধান,রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, 

লতিফা-শফি চৌধুরী মহিলা কলেজ।

চেয়ারম্যান :সিলেট সেন্টার ফর  ইনফরমেশন এন্ড ম্যাস মিডিয়া (সিফডিয়া)

ফেইসবুক কমেন্ট অপশন
এই বিভাগের আরো খবর
পুরাতন খবর খুঁজতে নিচে ক্লিক করুন


আমাদের ফেসবুক পেইজ