বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২, ২০ ২৬
শেখ আব্দুল মজিদ::
১৪ ডিসেম্বর ২০ ১৫
১০ :৩২ অপরাহ্ণ

শিশু ‘রাজন, আকমল, রাকিব, রিয়াজ’কে পিটিয়ে হত্যা: সরকারের দায় ও অসুস্থ্য সমাজের চিত্র

শেখ আব্দুল মজিদ:: দেশে দিন দিন শিশুদের হত্যায় মেতে উঠেছে পাষন্ডরা। এইসব শিশুদের মনমানসিকাত বুজার মতো পরিবেশ করে দিতে সরকার ও সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। শিশুদেরকে সুস্থ্যভাবে বেড়ে উঠতে পরিবার, সরকার যেমন দায়ি তেমনে আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় কম দায়ি নয়।

সিলেটে শিশু রাজন হত্যার প্রতিবাদে দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। তখন প্রশ্ন উঠে আইনশৃংখলা ও সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে। স্যোসাল মিডিয়ায় এনিয়ে বেশ লেখালেখিও হয়। কিন্তু মানুষের বিবেক কবে জাগ্রত হবে। কবে আমরা শিশুদের দিয়ে অমানসিক কাজ, নির্যাতন বন্ধ করবো।

এতো কিছুর পর কিছু নরপশু-পিচাষ রক্তোচুষি মানুষের কর্মকান্ডে দেশের মানুষ বিশ্বেব্যাপি লজ্জিত হচ্ছে। মাত্র তিন মাসের মাথায়, রাজন, আকমল, রিয়াজ, রাকিবকে পিটিয়ে হত্যা অসুস্থ্য সমাজের চিত্র ফুটে উঠেছে। এদিকে এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায়- শিশুদের মানবিক গুণে সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। রাজধানীর শিশু একাডেমি মিলনায়তনে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি আয়োজিত শিশুদের মৌসুমী প্রতিযোগিতা-২০১৫ এর সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে এ আহ্বান জানান তিনি। স্পিকার বলেন, শিশুদের সার্বিক বিকাশ ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সাংস্কৃতিক চর্চার ভূমিকা অপরিসীম। সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্য দিয়ে শিশুদের সুকুমার বৃত্তি ও মানবিক গুণাবলীর বিকাশ ঘটে। তাই আগামী দিনের সুনাগরিক হিসেবে শিশুদের গড়ে তুলতে তাদেরকে সাংস্কৃতিক চর্চার আরো বেশি সুযোগ করে দিতে হবে।

সিলেটে শিশু রাজন হত্যারই যেন পুনরাবৃত্তি। রাজন হত্যার ৪৩ দিনের মাথায় সিলেট শহরতলীর ঘোপালে এক শিশু শ্রমিককে পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। ২০ আগষ্ট বৃহস্পতিবার বিকেল সোয়া ৪টার দিকে ঘোপালস্থ ফুড মার্ক ব্রেড এন্ড বিস্কুট ফ্যাক্টরী সংলগ্ন শৌচাগারে এ ঘটনা ঘটে। নিহত শ্রমিক শিশুর নাম মোঃ আকমল হোসেন (১১)। সে সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার পাহাড়পুর গ্রামের দিনমজুর মোঃ এখলাছ মিয়ার পুত্র। এ ঘটনায় নিহত আকমলের পিতা এখলাছ মিয়া বাদি হয়ে ২ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরো ৫/৬ জনকে আসামী করে জালালাবাদ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। নং- ১৩ (২১-০৮-১৫)। মামলার আসামীরা হচ্ছে- শহরতলীর টুকেরবাজার ঘোপাল এলাকার লন্ডনী বাড়ি ও ফুড মার্ক ব্রেড এন্ড বিস্কুট ফ্যাক্টরীর মালিক হাজী মোঃ ওহাব আলী (৫৫) ও গোলাপগঞ্জ উপজেলার ফুলসাঈন গ্রামের মৃত হাসিবের পুত্র বর্তমানে ঘোপাল ফুড মার্ক ব্রেড এন্ড বিস্কুট ফ্যাক্টরীর মিস্ত্রি আব্দুর রহমান (৪০)। কিন্তু দু’দিনেও ওই ফ্যাক্টরীর মালিক ও মিস্ত্রিকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। তবে পুলিশ বলছে মামলাটির তদন্ত চলছে।

২১ আগস্ট শুক্রবার দুপুর আড়াইটার দিকে পুলিশ ময়না তদন্ত শেষে নিহত শিশু আকমল হোসেনের লাশ তার আত্মীয় স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। শুক্রবার মাগরিবের পর নামাজের জানাযা শেষে তার লাশ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। নিহত আকমলের ৪ ভাই ও ২ বোন। ভাইদের মধ্যে আকমল তৃতীয়। চুরির অপবাদ দিয়ে অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া শিশুকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে তেমনি রিয়াজকেও পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে।

১৩ বছর বয়সী শিশু রাজনকে যেভাবে গাছে বেঁধে পেটানো হয়েছিল, ১৪ বছর বয়সী শিশু রিয়াজকেও পেটানো হয়েছে একই কায়দায়। রাজন যেমন বারবার আকুতি করছিল মার থামানোর জন্য, রিয়াজও তাই করেছে। ৩ আগস্ট বিকালে খুলনার টুটপাড়ায় শরীফ মোটরস নামে এক মোটরসাইকেলের গ্যারেজে পায়ুপথে বাতাস প্রবেশ করিয়ে শিশু রাকিবকে হত্যা করা হয়। রাজনকে আর না মারতে যেমন প্রত্যক্ষদর্শীদের অনুরোধ গায়ে মাখেনি নির্যাতনকারী, রিয়াজের ক্ষেত্রেও ঘটেছে তেমনই। সিলেটের কুমারগাঁওয়ে রাজনকে গাছে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল ২০১৫ সালের ৮ জুলাই।

ঠিক কয়েকদিনের মাতায় সকালে ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের উথুরী-ঘাগড়া টাওয়ারের মোড় বাজারের কাছে হত্যা করা হয় রিয়াজকে। শিশুটিকে আটক করা হয় ভোর পাঁচটার পরে। আর নির্যাতন চলে এক ঘণ্টারও বেশি। সকাল সাতটার দিকে ছেলেটির মৃত্যুর পরই কেবল ক্ষান্ত দেয় নির্যাতনকারীরা। আর এরপর কেবল ঘটনাস্থল নয়, এলাকাও ছেড়ে পালিয়ে যায় তারা। রিয়াজ ঘাগড়া-উথুরী-ছিপান উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল। সে উথুরী গ্রামের সৌদি প্রবাসী সাইদুর রহমান শাহীনের ছেলে।

গফরগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল আহাদ খান বলেন, ‘এ বিষয়ে তদন্ত চলছে।’ একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী ঢাকাটাইমসকে জানান, ভোর পাঁচটার দিকে উথুরী-ঘাগড়া টাওয়ারের মোড় বাজারের ব্যবসায়ী আশরাফুলের মনিহারী দোকানের ‘তালা ভাঙার চেষ্টার’ কথা বলে রিয়াজকে আটক করেন ব্যবসায়ী আশরাফুল ও তার ভাই কামরুল এবং প্রতিবেশী রশিদ। পরে খুঁটির সাথে বেঁধে ফেলা হয় রিয়াজকে। লাঠি দিয়ে পা ও কাঁধে চলে বেদম পিটুনি। কিশোর বয়সী ছেলেকে এভাবে পিটুনির প্রতিবাদ জানান উপস্থিত লোকজন। ছেলেটি আসলেই চুরি করতে এসেছে কি না, তা যাচাই করতে বলেন।

আর সেটা করলে পুলিশে দেয়ার কথাও বলেন তারা। এভাবে মারলে ছেলেটা মারা যেতে পারে- এমন সতর্কতা উপেক্ষা করেও চলতে থাকে লাঠির আঘাত। আর এতে তার নেতিয়ে পড়া ছোট্ট দেহটির আর জেগে উঠা হয়নি। পুরোপুরি নিস্তেজ হয়ে যায় সে। প্রত্যক্ষদর্শী উথুরী গ্রামের ইমন ও মোতালেবের বর্ণণা অনুযায়ী, কিশোর রিয়াজ আকুতি করে বলছিল ‘আমি চুরি করতে আসি নাই। আমি অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। আমার জান ভিক্ষা দেন।’ মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর সকাল সাড়ে সাতটার দিকে তিন ব্যবসায়ী তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন বলেও জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা।

ঘটনার পর থেকে আশরাফুলসহ বাজারের বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী দোকান ঘর বন্ধ করে পলাতক রয়েছে। রিয়াজের দাদি খোদেজা খাতুন বিলাপ করতে করতে বলেন, শক্রতা করে তার নাতিকে অপবাদ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এজন্যই কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তার ‘ছাড়পত্র’ কবিতার এক জায়গায় লিখেছেন, ‘এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান; জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ পিঠে, চলে যেতে হবে আমাদের। চলে যাব তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ, প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল, এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।

’ শিশুর প্রতি মায়া-মমতা মিশ্রিত এবং তাদের প্রতি পৃথিবীর নাগরিকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে অনেক কবিই এমন কবিতা রচনা করে গেছেন। তাই আসুন আমরা শিশুদেরকে বেড়ে উঠতে সুন্দর সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলি।

ফেইসবুক কমেন্ট অপশন
এই বিভাগের আরো খবর
পুরাতন খবর খুঁজতে নিচে ক্লিক করুন


আমাদের ফেসবুক পেইজ