বুধবার, মে ২৭, ২০ ২৬
নাজমুল ইসলাম,কুলাউড়া ::
৩ সেপ্টেম্বর ২০ ২৪
৭:৪৮ অপরাহ্ণ

কুলাউড়ায় বন্যায় বাড়ি ঘর হারানো লোকজন ত্রান নয় পুনর্বাসন চান

অতি বৃষ্টি ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে গত ২১ আগস্ট গভীর রাতে মনু নদী ভেঙে কুলাউড়ার টিলাগাঁও ইউনিয়নের মিয়ারপাড়া এলাকায় পানি প্রবেশ করে কয়েকটি ইউনিয়ন ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

বিশেষ করে ভাঙনকৃত স্থানের আশ-পাশের বেশ কয়েকটি পাকা, কাঁচা বাড়ি ঘর মনু নদীর ভয়াল পানির স্রোতে ভেঙ্ েতছনছ করে নেয়। বর্তমানে এসব স্থানে পানি কমলেও স্থানীয় শত শত পরিবারের বাড়ি ঘরের ভাঙনকৃত চিত্র ফুটে উঠছে। স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্ষয়-ক্ষতির চিত্র। আকস্মিক ওই বন্যায় পানির স্রোতে মানুষের ঘড়বাড়ি, এলাকার রাস্তাঘাট ছাড়াও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে শত শত একর কৃষিজমি। বন্যার পানি কমলেও দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ এখনো কাটেনি। ঘরবাড়ি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বন্যা কবলিত এলাকার কয়েক হাজার মানুষ। এমন চিত্র কুলাউড়া উপজেলার টিলাগাঁও ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামে। সরেজমিন দেখা যায়, এবারের আকস্মিক বন্যায় উপজেলার মধ্য সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে টিলাগাঁও ইউনিয়নের মিয়ারপাড়া, হাজীপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকা। বন্যায় ইউনিয়নের প্রায় তিন শতাধিক পরিবারের বসতঘর পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বন্যার পানি কমে গেলেও ক্ষতিগ্রস্থ অনেক লোকই তাদের বসবাসকৃত গৃহে এখনো উঠতে পারেননি। অনেকেই মনু নদীর বেড়ি বাঁধে উঁচু জায়গায় অস্থায়ী ঝুঁপড়ি ঘর তৈরি করে সেখানে থাকছেন। অনেক পরিবার এখনো তাদের আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে রয়েছেন। এছাড়া তাদের একমাত্র সম্বল গৃহপালিত গরু, মহিষ ও ছাগল নদীর পাড়ে রেখেছেন। যাদের ঘর বন্যায় পুরোপুরি বিলীন হয়েছে তারা বেশিরভাগই দরিদ্র পরিবার।

এখন তাঁরা প্রত্যেকেই ঘর মেরামত করে বসবাসের উপযোগী করার জন্য সরকারি-বেসরকারি সহায়তা পাওয়ার আশায় পথ চেয়ে বসে রয়েছেন। বন্যার আগে সকল মানুষের ঘরবাড়ি সব ছিল। সর্বনাশা বন্যায় তাদের সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থরা জানান, অনেকে স্বপ্নের রোপা আমন ধান ও সবজি ক্ষেত চাষ করলেও বানের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তারা বেশ দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। বন্যায় সর্বশান্ত কৃষক, মৎস্যজীবী, শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের দরিদ্র মানুষ পড়েছেন এখন চরম বিপাকে।

ঘর মেরামত করার জন্য তাদের কোন সামর্থ্য নেই। তারা আক্ষেপ করে বলেন, ত্রাণ নয় এখন পুনর্বাসন চাই বসতঘরে থাকার জন্য। বন্যা দুর্গত এসব এলাকায় বাসিন্দারা সবাই গৃহপালিত পশুপালন করে থাকেন। বর্তমানে খামারীরা গো-খাদ্য সংকটে রয়েছেন। এছাড়া বন্যা পরবর্তী সময়ে শিশুসহ অনেকেই পানিবাহিত রোগে ভুগছেন।

উপজেলার টিলাগাঁও ইউনিয়নের মিয়ারপাড়া গ্রামে ৩০-৩৫টি ঘর পুরোপুরি বিধ্বস্ত ও ৪০-৫০টি ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। গ্রামের হতদরিদ্র বিধবা মহিলা তরিবুন বেগম (৪৫) নদীর পাড়ে বাঁধের উপর দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি জানান, অনেক আগে স্বামীকে হারিয়ে ১৬ বছরের একমাত্র ছেলেকে নিয়ে আমার দুঃখের সংসার। স্বামী মারা যাবার পর বিভিন্ন মানুষের বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করে কোনমতে দিনাতিপাত করছেন। আকস্মিক বন্যায় ঘর বাড়ি হারিয়ে তিনি পাগলের মতো বিলাপ করছেন।

একই গ্রামের মহরম উল্লার ছেলে সিএনজি চালক সুজন মিয়া জানান, মিয়ারপাড়ার যে স্থান দিয়ে প্রায় ৫০০ ফুট বাঁধ ভেঙ্গেছে ওই বাঁধের নীচে আমাদের ছয় ভাইয়ের পাকার ঘর ছিল। তিন ভাইয়ের পাকা ঘরটি বন্যার পানিতে বিলীন করে নিয়েছে এবং আমাদের আরো তিন ভাইয়ের ঘরের সিংহভাগ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। দিনমজুর শামীম আহমদ বলেন, বন্যায় আমার কাঁচা ঘরটি ভেঙ্গে গেলে পানির ভয়াবহ স্রোতে ঘরের উপরের টিনের চালা ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

মাটির ঘরটি একদম বিলীন হয়ে যায়। সরকারের কাছে পুনর্বাসনের জন্য সহায়তা কামনা করেন শামীম। তার পাশের ঘর ছিল আরেক দিনমজুর রহুল মিয়ার। ৪ জনের পরিবার খুবই কষ্ট করে চলছিল কিন্তু বন্যায় ওই কাঁচা ঘরটিও পানির সাথে বিলীন হয়ে যায়। মিয়ারপাড়া গ্রামের জমসেদ আলী, ছালিক মিয়া, তোয়াব আলী, আমির উদ্দিন, লিলই বেগমের ঘরসহ অনেকের ঘর ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এদিকে হাজীপুর গ্রামের রুনা বেগম, বাবুল মিয়া, ফয়জু মিয়া, আজিজুল মিয়া, রাজা মিয়া, হারুন মিয়া, জলাল মিয়া, ইন্তু মিয়া, মজই মিয়া, সাইমুল্লাহ, লতিফ মিয়াসহ ২৫-৩০টি মাটি ও বেড়ার তৈরি কাঁচা ঘর বন্যার পানিতে বিলীন হয়ে গেছে। তারা সবকিছু হারিয়ে এখন নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।

দুর্গত এলাকার ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ চলমান এই কঠিন দুর্যোগে তাদের ঘর পুনঃনির্মাণে সহায়তা দিয়ে পাশে দাঁড়ানোর জন্য সকলের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন। টিলাগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ আব্দুল মালিক বলেন, সৃষ্ট বন্যায় খর¯্রােতা মনু নদীর পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত ছিলো। ইউনিয়নের তিনটি স্থান দিয়ে প্রতিরক্ষা বাঁধে ভেঙ্গে যাওয়ায় ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়।

এতে শত শত মানুষের ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, মৎস্যখামারসহ অনেক সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অনেক মানুষ নিঃস্থ হয়ে পড়েছে। তাদের এই ক্ষতি পোষাতে অনেক সময় লাগবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মহি উদ্দিন বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থদের ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ার চিত্র সরেজমিনে দেখেছি। ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা প্রস্তুত কাজ চলমান আছে। প্রাথমিকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ ২৭ জন পরিবারের তালিকা করা হয়েছে। পরবর্তীতে প্রস্তুতকৃত তালিকা উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে। পরে তাদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা করা হবে। তিনি আরো বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে ৩৬ বান ঢেউটিন, নগদ অর্থ, ১৫শ প্যাকেট শুকনো খাবার ও ৪৭ মেট্টিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।

ফেইসবুক কমেন্ট অপশন
এই বিভাগের আরো খবর
পুরাতন খবর খুঁজতে নিচে ক্লিক করুন


আমাদের ফেসবুক পেইজ