রবিবার, নভেম্বর ১, ২০ ২৬
মো: ছালিম আহমদ খান, ইয়ুথ লিডার
১ নভেম্বর ২০ ২৬
১১:৩৯ পূর্বাহ্ণ

জাতীয় যুব দিবস: তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়েই গড়তে হবে আগামীর বাংলাদেশ

একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার প্রাকৃতিক সম্পদ কিংবা অবকাঠামো নয়; বরং সেই দেশের কর্মক্ষম, সৃজনশীল, উদ্যমী ও স্বপ্নবাজ তরুণ জনগোষ্ঠী। তরুণরাই একটি জাতির বর্তমানের প্রাণশক্তি এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। তাদের চিন্তা, মেধা, শ্রম, সাহস ও উদ্ভাবনী শক্তির ওপর নির্ভর করে একটি দেশের আগামী দিনের গতিপথ।

তাই যুবসমাজকে যথাযথভাবে গড়ে তোলা, তাদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো এবং জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই প্রতিবছর পালিত হয় জাতীয় যুব দিবস।

জাতীয় যুব দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি যুবসমাজের সম্ভাবনা, সমস্যা, প্রত্যাশা ও দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবার উপলক্ষ। এ দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য তরুণদের শুধু স্বপ্ন দেখালেই হবে না, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের উপযুক্ত পরিবেশও তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে তরুণদের অবদান অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল।

ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রাম, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং বিভিন্ন জাতীয় সংকটে যুবসমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পেছনে তরুণদের সাহস, আত্মত্যাগ ও সক্রিয় অংশগ্রহণের ইতিহাস রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ আমাদের দেখিয়েছে, প্রয়োজনের মুহূর্তে তারুণ্য একটি জাতির পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।

তবে শুধু ইতিহাসের গৌরব নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। বর্তমান বাস্তবতায় যুবসমাজের সামনে রয়েছে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। শিক্ষিত বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার ঘাটতি, মাদকাসক্তি, হতাশা, সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিক মূল্যবোধের সংকট এবং সঠিক দিকনির্দেশনার অভাব তরুণদের সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

অনেক তরুণ উচ্চশিক্ষা অর্জন করেও নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন না। আবার অনেক তরুণের মধ্যে প্রচণ্ড সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, পুঁজি ও সহযোগিতার অভাবে তারা নিজেদের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। এই বাস্তবতা পরিবর্তনে যুব উন্নয়ন কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও সময়োপযোগী করতে হবে।

শুধু প্রশিক্ষণ প্রদান কিংবা সনদ বিতরণের মধ্যে যুব উন্নয়ন সীমাবদ্ধ থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। প্রশিক্ষণের সঙ্গে কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, বাজারসংযোগ, সহজ শর্তে ঋণ এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সিং, তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল মার্কেটিং, আধুনিক কৃষি, কারিগরি শিক্ষা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং নতুন নতুন প্রযুক্তিনির্ভর কর্মক্ষেত্রে তরুণদের দক্ষ করে তুলতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, কর্মসংস্থানই যুব উন্নয়নের একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। একজন আদর্শ তরুণকে দক্ষতার পাশাপাশি মানবিক, নৈতিক, দায়িত্বশীল ও দেশপ্রেমিক হতে হবে।

সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, রক্তদানে এগিয়ে আসা, দুর্যোগে সহযোগিতা করা, পরিবেশ সংরক্ষণ, শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রাখা এবং সামাজিক সচেতনতা তৈরির মতো কাজগুলোও যুবসমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

কারণ একটি উন্নত রাষ্ট্র গড়তে যেমন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন মানবিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য তরুণ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, সামাজিক উদ্যোগ ও মানবিক কার্যক্রমের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনে কাজ করছেন। তারা নিজেদের সময়, শ্রম ও সামর্থ্য ব্যয় করে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক ক্ষেত্রে এসব সংগঠন প্রয়োজনীয় সহযোগিতা, স্বীকৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। স্থানীয় পর্যায়ে সক্রিয় যুব সংগঠনগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ, আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতা এবং কাজের স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি।

বিশেষ করে গ্রাম ও মফস্বলের তরুণদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। যুব নেতৃত্ব বিকাশের ক্ষেত্রেও নতুন করে ভাবতে হবে। তরুণদের শুধু সভা-সমাবেশে উপস্থিতি কিংবা আনুষ্ঠানিক পদ-পদবি দিয়ে মূল্যায়ন করা যথেষ্ট নয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। স্থানীয় সরকার, সামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, পরিবেশ এবং জাতীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যোগ্য ও দক্ষ তরুণদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে। নেতৃত্বের চর্চা হতে হবে যোগ্যতা, সততা, জবাবদিহি ও জনকল্যাণের ভিত্তিতে। এখানে রাষ্ট্রের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং সমাজের সচেতন ব্যক্তিদেরও দায়িত্ব রয়েছে। পরিবারকে সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা ও ইতিবাচক মানসিকতা গঠনে ভূমিকা রাখতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানের পাশাপাশি বাস্তবমুখী দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও নেতৃত্বের চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। গণমাধ্যমকে তরুণদের সাফল্যের পাশাপাশি তাদের বাস্তব সমস্যা ও সম্ভাবনার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে। তরুণদের প্রতিও রয়েছে কিছু মৌলিক প্রত্যাশা। শুধু রাষ্ট্রের কাছে সুযোগ দাবি করলেই হবে না, নিজেদেরও যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। সময়ের সঠিক ব্যবহার, জ্ঞান অর্জন, দক্ষতা বৃদ্ধি, নৈতিকতা চর্চা এবং ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, গুজব, অসহিষ্ণুতা, হিংসা ও নেতিবাচক প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে এসে জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও মানবিকতার চর্চা বাড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে, তারুণ্যের প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু বয়সে নয়; বরং চিন্তা, কর্ম, সততা ও দায়িত্ববোধে। আমাদের প্রত্যাশা, জাতীয় যুব দিবসের কর্মসূচি শুধু আলোচনা সভা, র‍্যালি, পুরস্কার কিংবা সনদ বিতরণে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এ দিবসকে কেন্দ্র করে যুবসমাজের সমস্যা চিহ্নিত করা, বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগকে শক্তিশালী করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় যুব উন্নয়ন কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে হবে।

বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, নারী ও গ্রামীণ তরুণদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে কোনো তরুণ কেবল সুযোগের অভাবে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দেবে না; যেখানে মেধা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন হবে; যেখানে তরুণরা চাকরির প্রত্যাশী হওয়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোক্তা হয়ে উঠবে; যেখানে মানবিকতা, সততা, দক্ষতা ও দেশপ্রেম হবে তারুণ্যের পরিচয়।

জাতীয় যুব দিবস আমাদের সামনে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নতুন করে তুলে ধরুক। রাষ্ট্র তরুণদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করুক, সমাজ তাদের ইতিবাচক উদ্যোগকে সহযোগিতা করুক এবং তরুণরা নিজেদের মেধা, শ্রম ও যোগ্যতা দিয়ে দেশ গঠনে এগিয়ে আসুক।

কারণ আজকের তরুণরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে। তাদের হাত ধরেই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। তারুণ্যকে অবহেলা নয়, তারুণ্যকে যথাযথ মূল্যায়ন ও ক্ষমতায়নই হোক জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।

তারুণ্য জাগুক সম্ভাবনায়, যুবশক্তি এগিয়ে যাক মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে।

ফেইসবুক কমেন্ট অপশন
এই বিভাগের আরো খবর
পুরাতন খবর খুঁজতে নিচে ক্লিক করুন


আমাদের ফেসবুক পেইজ