১১:৩৩ পূর্বাহ্ণ
পহেলা বৈশাখে ইলিশ ভোজন সংস্কৃতি বর্জন করুন
রুবেল আহমদ:: বাঙ্গালির একটি সার্বজনীন উৎসব পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ যা প্রতি বছর ১৪ই এপ্রিল পালিত হয়। ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর হিজরিপঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করা হত। নতুন ফসল ওঠার সময় ছিল চৈত্র মাস। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফসল ওঠার সময়ের সাথে মিলত না, এতে অসময়ে কৃষকদের কাছথেকে খাজনা আদায় করা হত।ফসল ওঠার সময়েই খাজনা আদায় এবং খাজনা আদায়ে সুষ্ঠতা প্রণয়নের লক্ষ্যে সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়।
এই সময়ে প্রত্যেককে খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হত। পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসিদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। তখনকার সময়ে এই দিন পালনের উদ্দেশ্য ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। প্রকৃতপক্ষে হালখাতা হল বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। পুরনো বছরের হিসাব খাতা বন্ধ করে নতুন করে হিসাব খাতা খোলা।
এই বাংলা সন গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহনের সময় (৫ ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়। সে সময় থেকে পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। সকল শ্রেণির বাঙালি প্রায় একই রেওয়াজে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে নতুন জামাকাপড় পরে পরিচিত প্রিয়জনের সঙ্গে পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় সহ আনুষ্ঠানিক শোভাযাত্রা, মেলা, পান্তাভাত খাওয়া ইত্যাদি নানান কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হয়। বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্যবাহী শুভেচ্ছা বাক্য হল “ শুভ নববর্ষ”।
বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সরকারের তরফ থেকে এবছর পহেলা বৈশাখের সকল অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে। বাঙালি সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় উৎসব এই বৈশাখ ঘিরে প্রতিবছর যে জমজমাট বাহারি রঙ্গিন পোশাক আর নানা পণ্যের ব্যবসা বাণিজ্যের যে প্রস্তুতি থাকে এবার সে চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। যার প্রভাব পড়েছে এই উৎসবকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বাজারের ওপর।
পান্তা ভাত গ্রামীণ বাঙালি জনগোষ্টীর একটি জনপ্রিয় খাবার।
নৈশভোজের জন্য রান্না করা ভাত বেঁচে গেলে সংরক্ষণের জন্য ভিজিয়ে রাখা হত। পরের দিন এই পানিতে রাখা ভাতের নাম হতো পান্তা ভাত। সাধারণত লবণ, কাঁচামরিচ ও পেঁয়াজ মিশিয়ে এই পান্তা ভাত খাওয়া হয়। আবার অনেকে আলু, বেগুন, শুটকি ভর্তা বা সরিষার তেল দিয়ে পান্তা ভাতআরোও সুস্বাধু করে।
সাধারণত ভাত বেশিক্ষণ রেখে দিলে তা পঁচে খাবার অনুপযোগি হয়ে পড়ে। কিন্তু পানি দিয়ে রাখলে গাজনকারী ব্যাক্টেরিয়া সেখানে ল্যাকটিক এসিড তৈরী করে যার ফলে পান্তা ভাতের অম্লত্ব বেড়ে যায় তখন পচনকারি ও অন্যান্য ক্ষতিকারক ব্যাক্টেরিয়া, ছত্রাক ভাত নষ্ট করতে পারেনা। পহেলা বৈশাখে পান্তা ভাতের সাথে ভাজা ইলিশ সহযোগে খাওয়ার রেওয়াজ নিয়ে সারাদেশে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
নববর্ষে পান্তা ইলিশ খাওয়ার সংস্কৃতি আমাদের দেশে শুরু হয় নব্বইয়ের দশকে। বিশেজ্ঞদেরমতে বৈশাখে পান্তা ভাতের সাথে ইলিশ খাওয়ার রেওয়াজ গত হাজার বছরের ইতিহাসে নেই। উপরন্তু এই অর্বাচীন প্রথা আমাদের ইলিশ সম্পদের ধ্বংসের একটা ষড়যন্ত্র। এই বিভ্রান্ত সংস্কৃতির বিপক্ষে ২০১৩ সালে প্রথম সংঘবদ্ধ অবস্থান নেয় ‘কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন সকল সদস্য ও শুভাণুধ্যায়ীর প্রতি আহ্বান জানায় নববর্ষের মেনুতে ইলিশ বর্জনের।
পান্তা পিয়া বা পান্তার সাথে তেলাপিয়ার এক সুলভ ও বিকল্প প্রস্তাব করে উৎসবকে সার্বজনীন করার আহ্বান জানানো হয়। কারণ একটি মা ইলিশ একবারে ডিম পাড়ে দশ থেকে তেইশ লক্ষ। অথচ এই মা ইলিশের ডিম পাড়ার সময় হয় বৈশাখে। এই সময় যখন মাছ মেরে ফেলছেন তখন আর মাছের বংশ বিস্তার হচ্ছে না।
যার ফলে দেশে ইলিশ হয়ে পড়ছে দুষ্প্রাপ্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে সংস্কৃতিকর্মী, বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজের সর্বস্থরে বৈশাখে ইলিশ বর্জনের জোর প্রচারণা শুরু হয় এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও ঘোষণা দেন নববর্ষ উদযাপনের দিন খাদ্য তালিকায় ইলিশের কোন পদ রাখছেন না তিনি। বৈশাখে ইলিশ খাওয়ার এই ভ্রান্ত রীতি পুরোপুরি বন্ধ হলে অর্থনৈতিক এই মন্দার সময়েও সমৃদ্ধ হবে ইলিশ নির্ভর দেশীয় জিডিপি। কারণ পৃথিবীর যে বারোটি দেশে ইলিশ হয় তার সত্তর শতাংশ হয় বাংলাদেশে। আসুন সকলে মিলে বৈশাখে ইলিশ খাওয়ার এই অপসংস্কৃতি বর্জন করি, দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করি। স্রষ্টা আমাদের সহায় হউন।
লেখক: কলামিস্ট, প্রবাসী।