বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২, ২০ ২৬
ড্রীম সিলেট ডেস্ক
১০ জুলাই ২০ ১৫
৪:০ ১ অপরাহ্ণ

বর্বরতার দীর্ঘ ছায়া

রুবেল আহমদ:: দেশে প্রতিনিয়ত বাড়ছে নৃশংস-বর্বরোচিত কায়দায় শিশু নির্যাতনের ঘটনা। এমনকি শারীরিক নির্যাতনের মাত্রা ছাপিয়ে হত্যাকাণ্ডের মতো মর্মন্তুদ ঘটনাও ঘটছে। নানা অপবাদে শিশুর ওপর নির্যাতনের খড়্‌গ নেমে আসছে। উদ্বেগের বিষয় হলো- সামাজিক পরিসরে এর ক্রমেই বিস্তৃতি ঘটছে। 'চুরির অপবাদ দিয়ে নির্মমতা' শিরোনামে প্রকাশিত সচিত্র ওই প্রতিবেদনে বারো বছরের মুন্না পাশি ও তেরো বছরের জগৎ নুনিয়াকে গাছের সঙ্গে বেঁধে স্থানীয় ইউপি সদস্যের উপস্থিতিতে কয়েকজন মিলে কীভাবে বেধড়ক পিটিয়েছে তা উঠে এসেছে। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার কুরমা চা বাগানে মোবাইল চুরির অপবাদ তুলে এ ঘটনা ঘটিয়েছে নির্যাতকরা।

প্রায় নিত্যই দেশের কোথাও না কোথাও এমন ঘটনা ঘটছেই। নিষ্ঠুরতা-নির্মমতার সব খবর সংবাদ মাধ্যমে আসে না। নিকট অতীতে সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে শিশু তুহিনকে পরিবারের সদস্যরা প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে কীভাবে হত্যা করেছিল তা অনেকেরই বিস্মৃত হওয়ার কথা নয়। অনেকেরই শিশু রাজন হত্যার মর্মন্তুদতাও মনে থাকার কথা। প্রভাবশালী দুর্বৃত্তরা কী বীভৎস কায়দায় সামিউল আলম রাজনকে হত্যা করেছিল! এ রকম মর্মন্তুদতার দৃষ্টান্ত আরও রয়েছে। খণ্ড খণ্ড এই চিত্রই সামগ্রিকভাবে সাক্ষ্য দেয় সমাজের কোনো কোনো অংশ এখনও কীভাবে অন্ধকারে ঢেকে আছে। এই অন্ধকার শুভবোধসম্পন্নদের বিবেক স্তম্ভিত করে দিচ্ছে।

শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা আমাদের সমাজের নতুন কোনো চিত্র নয়। সামাজিক, পারিবারিক বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে এমন কদর্যতার ছায়া ক্রমে দীর্ঘ হওয়ার ফলে মনে হয়- বিচারহীনতার অপসংস্কৃতিই এ জন্য বহুলাংশে দায়ী। সম্প্রতি শিশুদের নিয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) একটি গবেষণা করে যে তথ্যচিত্র তুলে ধরেছে তা উদ্বিগ্ন না করে পারে না। বিগত এক বছরে দেশে শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে এক হাজার ৩১২টি। এর মধ্যে হত্যার ঘটনা প্রায় অর্ধেক। হত্যা, শারীরিক নানারকম নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, অ্যাসিড আক্রান্ত হওয়ার চিত্র সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা নির্যাতনের দৃষ্টান্তও রয়েছে। আর গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুরা তো অহরহ নির্মমতা-নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি হচ্ছেই।

সংবাদমাধ্যম মারফত জ্ঞাত হয়েছি-থেমে নেই শিশু নির্যাতনের মতো নিষ্ঠুরতাও। গত বছর সংশ্নিষ্ট সংসদীয় কমিটি পর্যন্ত শিশু নির্যাতন বেড়ে যাওয়ার কারণে উদ্বেগ প্রকাশ করে কিছু সুপারিশও করেছিল। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার কুরমা চা বাগানে সংঘটিত ঘটনাটি ফের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে তথাকথিত জন ও সমাজ প্রতিনিধিদের নিষ্ঠুর দৌরাত্ম্য। ২০১৫ সালের ৮ জুলাই সিলেটের কুমারগাঁওয়ে শিশু সামিউল আলম রাজনকে নৃশংসভাবে হত্যার দৃশ্য কতিপয় মানুষরূপী দানব ভিডিও করে তা আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে এও প্রমাণ করেছিল, সমাজ এখনও কতটা কীটদুষ্ট। ওই ঘটনার দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তযোগ্য রায় জনমনে আশা জাগিয়েছিল- সমাজে হয়তো এমন ক্ষত সৃষ্টির পথ রুদ্ধ হবে। কিন্তু না, সমাজে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিকৃত মানসিকতাধারীরা এখনও দোর্দণ্ড প্রতাপে অপকর্মে লিপ্ত থেকে পৈশাচিক উল্লাসের প্রকাশ ঘটাচ্ছে। রাজন হত্যার দ্রুত বিচার একটি খণ্ডিত দৃষ্টান্ত। অনেক ক্ষেত্রেই এখনও বিচারহীনতার অপসংস্কৃতিই পুষ্ট। এ জন্য সর্বাগ্রে দায় বর্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিতদের ওপর।

মামলা গঠন-সাজানো-চার্জশিট প্রদানে কালক্ষেপণ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ ব্যাপারে তাদের অনাকাঙ্ক্ষিত-অগ্রহণযোগ্য বৈরী আচরণও মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়। একই সঙ্গে মূল্যবোধের অবক্ষয়, নৈতিক শিক্ষার ঘাটতিও এ জন্য কম দায়ী নয়। কমলগঞ্জের কুরমা চা বাগানের মর্মন্তুদ ঘটনাটি এ থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। আশু এর দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকারই কাম্য। তবে বিদ্যমান প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা দূর করতে না পারলে সহজে কাটবে না আঁধার।

লেখক: কলামিস্ট, প্রবাসী।

 

ফেইসবুক কমেন্ট অপশন
এই বিভাগের আরো খবর
পুরাতন খবর খুঁজতে নিচে ক্লিক করুন


আমাদের ফেসবুক পেইজ