৩:২০ অপরাহ্ণ
বিশ্ব ধরিত্রী দিবস : আমাদের ধরিত্রী সম্পর্কে জেনে নেই কিছু তথ্য
পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য যে দিবস বিশ্বব্যাপী পালিত হয় তা হলো বিশ্ব ধরিত্রী দিবস। ধরিত্রী শব্দটি এসেছে ধরনী বা ধরা থেকে। যার অর্থ হলো পৃথিবী। ১৯৬৯ সালে সানফ্রান্সিস্কোতে ইউনোস্কো সম্মেলনে শান্তিকর্মী জন ম্যাককনেল পৃথিবী নামক মায়ের সম্মানে একটি দিন উৎসর্গ করতে প্রস্তাব করেন এবং উত্তর গোলার্ধে বসন্তের প্রথম দিন হিসাবে ১৯৭০ সালের ২১ মার্চ প্রথম এই দিনটা উদযাপিত হয়। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এই দিনই পরে একটা পরিঘোষণায় অনুমোদিত হয়।
একমাস পর একটা পরিবেশগত শিক্ষামূলক দিন হিসাবে একটা আলাদা ধরিত্রী দিবসের অবতারণা করেন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর গেলর্ড নেলসন, যেটা প্রথম সংঘঠিত হয় ২২ এপ্রিল ১৯৭০ সালে। ধরিত্রী দিবসের ২০ বছর পূর্তিতে ১৯৯০ সালে আরেকটি বড় আন্দোলন শুরু হয়। ওই বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০ কোটি মানুষ ধরিত্রী দিবস পালন করে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন সিনেট নেলসনকে ১৯৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব “প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অফ ফ্রিডম” ভূষিত করেন।
বর্তমানে আর্থডে নেটওয়ার্ক কর্তৃক বিশ্বব্যাপী সমন্বিত ভাবে পালিত হয় দিবসটি। ১৯৩টির অধিক দেশে প্রতিবছর এই দিবস পালন করা হয়। ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত ধরিত্রী সম্মেলনেও ধরিত্রী দিবস প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। নতুন শতাব্দীর শুরুতে ২০০০ সালে ধরিত্রী দিবসে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক প্রচারনা চালানো হয়।
সে বছর প্রায় ৫০০০ পরিবেশবাদী সংগঠন ১৮৪টি দেশে কাজ করেন ধরিত্রী দিবসকে সফল করার জন্য। ২০০৯ সালে কোপেন হেগেনে বিশ্বের রাষ্ট্র নেতারা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে একটি সর্বজনীন চুক্তি সই করতে ব্যর্থ হয়। ফলে ২০১০ সালের ধরিত্রী দিবস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। সে বছর ধরিত্রী দিবসে যুক্তরাষ্ট্রে ২,৫০,০০০ মানুষ নিয়ে একটি বড় সমাবেশ হয়। তাছাড়া একটি ক্যাম্পেইন চালু করা হয়।
এই ক্যাম্পেইনের আওতায় মানুষকে পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষরোপণ, কার্বন নিঃসরণ হ্রাসকরণ, প্লাস্টিক দূষন বন্ধ করা, মাংস কম খাওয়া প্রভ‚তি বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। ক্যাম্পেইনটিতে বর্তমানে ২ বিলিয়নের অধিক কার্যক্রম লিপিবদ্ধ রয়েছে। ধরিত্রীকে রক্ষা করতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে সকল মানুষকে পরিবেশ সচেতন করে তুলতে হবে। বৃক্ষ কর্তন রোধ, বৃক্ষরোপন ও বনসৃজনের দিকে নজর দিতে হবে। দুরবর্তী স্থানে যাবার জন্য ব্যক্তিগাড়ি ব্যবহার না করে পাবলিক যান বহন ব্যবহার করতে হবে ।
কাছাকাছি পথ অতিক্রম করতে হাঁটা বা সাইকেল ব্যবহার করতে হবে। জীবাস্ম জ্বালানি যথাসম্ভব কম ব্যবহার করতে হবে। জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষনের দিকে সকল মানব জাতিকে নজর দিতে হবে। রি-সাইকেল পদ্ধতির মাধ্যমে দ্রব্যের পুনর্ব্যবহার করতে হবে। পরিবেশ রক্ষার জন্য বিভিন্ন গবেষণা মূলক কাজে প্রশাসনকে ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। প্রকৃতি আসলে নিজের শূন্যস্থান নিজেই পূরণ করে নেয়, কারো জন্য অপেক্ষা করে না।
ধরিত্রীকে অর্থাৎ প্রকৃতিকে আমরা আমাদের কর্মকান্ডের মাধ্যমে ধ্বংসের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমাদের ধরিত্রী সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নেয়া যাক এবার। আমাদের এই পৃথিবীকে অনেক সময়েই গোল বলা হয়ে থাকে। তবে আসলে কিন্তু পৃথিবীর আকৃতি সম্পূর্ণ গোল নয়। দুই মেরুতে সমতল আকৃতির গ্রহ এই পৃথিবী।
সঠিকভাবে বলতে গেলে এই আকৃতি ‘উপগোলক’ ধরনের। অন্যান্য গ্রহের মতোই মহাকর্ষীয় বল ও অক্ষরেখার ওপর ভর করে ঘূর্ণনের ফলে যে কেন্দ্রাতিগ শক্তি উৎপাদিত হয়, তারই প্রভাবে মেরু অঞ্চল দুটি সমতল ও নিরক্ষ রেখার কাছে চওড়া হয়ে গেছে পৃথিবী। এ কারণেই দুই মেরুর ব্যাসের তুলনায় নিরক্ষরেখায় পৃথিবীর ব্যাস প্রায় ৪৩ কিলোমিটার বেশি। ভূপৃষ্ঠের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই পানি। হিমবাহ, জলাভূমি, হ্রদ, নদী, সাগর প্রভৃতি এই পানির উৎস।কঠিন, তরল ও বায়বীয় অবস্থাতেও পানি পাওয়া যায়। তবে পৃথিবীর ৯৭ শতাংশ পানিই সমুদ্রের লবণাক্ত পানি।
ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০০ কিলোমিটার ওপরে মহাকাশ বায়ুমণ্ডল ও মহাকাশের মধ্যের সীমানা, যা কারমান লাইন নামে পরিচিত, সেটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার ওপরে। বায়ুমণ্ডলের মোট ভরের প্রায় ৭৫ শতাংশই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রথম ১১ কিলোমিটার উচ্চতার মধ্যেই পাওয়া যায়। সৌরমণ্ডলের গ্রহগুলোর মধ্যে ঘনত্বের দিক দিয়ে প্রথম এবং আকারের দিকে পৃথিবী পঞ্চম বৃহত্তম গ্রহ।পৃথিবীর একেবারে কেন্দ্রে রয়েছে এক হাজার ২০০ কিলোমিটার ব্যাসের গোলাকৃতির একটি বল।
ধারণা করা হয়, ওই বলটির ৮৫ শতাংশই লোহা, আর ১০ শতাংশ আছে নিকেল । পৃথিবীই একমাত্র গ্রহ, যাতে প্রাণ আছে ।মহাবিশ্বে শুধু পৃথিবীতেই প্রাণ আছে বলে এখন পর্যন্ত প্রমাণ করা গেছে। পৃথিবীর বুকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ লাখ ২০ হাজার প্রজাতির প্রাণীর তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। তবে এই সংখ্যা মোট প্রাণীর প্রজাতির একটা ছোট অংশ। বিজ্ঞানীরা ২০১১ সালে একটা ধারণা করেছিলেন, পৃথিবীর প্রকৃতিতে সম্ভবত ৮০ লাখ ৭০ হাজারের মতো প্রজাতি থাকতে পারে। প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর জন্ম হয়েছিল এবং পৃথিবীর গঠন, তার ভূবৈজ্ঞানিক ইতিহাস ও অক্ষের কারণে কয়েক লাখ, এমনকি কোটি বছর ধরেই এই গ্রহে প্রাণের সঞ্চার রয়েছে। পৃথিবীর সব জায়গায় মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এক নয় ।
যেহেতু পৃথিবী পুরোপুরি গোল নয় এবং এর ভর সব জায়গায় সমানভাবে বিস্তৃত নয়, তাই মাধ্যাকর্ষণ শক্তির তারতম্য ঘটে। যেমন, নিরক্ষরেখা থেকে যত মেরুর দিকে যাওয়া যাবে, মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ধীরে ধীর বাড়তে থাকবে। যদিও মানবদেহে সেই তারতম্য বিশেষ অনুভব করা যায় না। বৈপরীত্যে ভরা এই পৃথিবী। আমাদের এই গ্রহটিতে চরম বৈপরীত্য রয়েছে। ভৌগোলিক এলাকার তারতম্যে একেক এলাকার আবহাওয়াতেও রয়েছে ব্যাপক ফারাক। বলতে গেলে প্রতিটি এলাকারই নিজস্বতা আছে।
পৃথিবীর উষ্ণতম স্থান বলে বেশ কয়েকটি জায়গার নাম উঠে আসে, কিন্তু এযাবৎকালে সব থেকে বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডেথ ভ্যালি’তে। সেখানে ১৯১৩ সালের ১০ জুলাই থার্মোমিটারের পারদ ছুঁয়েছিল ৫৬.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।আরেক চরম আবহাওয়া দক্ষিণ মেরুতে। সেখানকার ‘ভস্তক’ গবেষণা স্টেশনে ১৯৮৩ সালের ৩১ জুলাই তাপমাত্রা নেমে গিয়েছিল মাইনাস ৮৯.২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
বিশ্বের সব থেকে বড় জীবন্ত কাঠামো আমাদের এই ধরিত্রী। অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে অবস্থিত ‘দ্য গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ’ই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জীবন্ত কাঠামো, যেটি বিকশিত হয় এমন অসংখ্য জীবসত্তার সমন্বয়ে গঠিত। এটি এতই বড় যে মহাকাশ থেকেও চোখে পড়ে। প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত দ্য গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে হাজার হাজার প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণী রয়েছে। ইউনেসকো ১৯৮১ সালে এটিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের স্বীকৃতি দেয়। পৃথিবীই একমাত্র গ্রহ, যেখানে সক্রিয় টেকটনিক প্লেট আছে টেকটনিক প্লেট, অর্থাৎ ভূ-পৃষ্ঠের কঠিন আবরণের খণ্ডাংশ এখনো স্থির নয়। এর অর্থ হলো আমাদের এই গ্রহ এখনো পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এই প্লেট বা খণ্ডাংশগুলো সরে যাওয়ার ফলেই পর্বতমালা যেমন তৈরি হয়, তেমনই ভূমিকম্প বা আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্ন্যুৎপাতও হয়। টেকটনিক প্লেট কত দিন পরপর সরে যাবে, তা পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আবার সমুদ্রতলে স্থায়ী পরিবর্তনের মাধ্যমে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো গ্রিনহাউস গ্যাসের পুনর্ব্যবহারেও সহায়তা করে টেকটনিক প্লেটের এই সরে যাওয়া। পৃথিবীর চারপাশে রয়েছে প্রতিরোধী প্রাচীর সূর্য থেকে সমানে ধেয়ে আসা অতি শক্তিশালী কণাসমূহকে আটকে দেয় পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র।পৃথিবীর একেবারে কেন্দ্রস্থল থেকে শুরু হয়ে যেখান দিয়ে সৌর বাতাস বয় সেই সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত এই চৌম্বক ক্ষেত্র।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ । নিলয় ১৭৪/৩ পূর্ব নতুন পাড়া, সুনামগঞ্জ। ০১৭১৬৭৩৮৬৮৮ sdsubrata2022@gmail.com