রবিবার, নভেম্বর ৮, ২০ ২৬
জুবায়ের আহমদ, জকিগঞ্জ থেকে
৮ নভেম্বর ২০ ২৬
৫:৪৯ অপরাহ্ণ

জকিগঞ্জে ৭৪টি নিবন্ধিত সমিতি, সঞ্চয় ও ঋণদান কার্যক্রমে সক্রিয় মাত্র একটি; আট বছর আগেও একই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ
জকিগঞ্জে সমবায় দিবস পালন: সমবায়ের নামে টাকা জমা, ফেরত পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন সদস্যরা
সমবায়ের নামে সঞ্চয় করেছিলেন ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার আশায়। কিন্তু প্রয়োজনের সময় সেই টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে পড়েছেন ভোগান্তিতে। সিলেটের জকিগঞ্জের সোনার বাংলা বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করেছেন এক সদস্যের স্বামী। তাঁর দাবি, স্ত্রীর জমা করা ৫০ হাজার ১০০ টাকা ফেরত পেতে একাধিকবার সমিতির কার্যালয়ে গিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত আবেদনও করেছেন তিনি।

সমিতিটির বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। আট বছর আগেও প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, ঋণ বিতরণে অনিয়ম, ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে লেনদেনসহ নানা অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। ওই সময় প্রশাসনিক তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়। তবে সেই তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল বা অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে জকিগঞ্জ উপজেলায় নিবন্ধিত ৭৪টি সমবায় সমিতির মধ্যে ৫৪টি সক্রিয় থাকলেও সঞ্চয় ও ঋণদান কার্যক্রম পরিচালনাকারী পাঁচটি সমিতির মধ্যে বর্তমানে চালু রয়েছে মাত্র একটি। সেটি সোনার বাংলা বহুমুখী সমবায় সমিতি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতা, সদস্যদের আমানত এবং অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

গতকাল রোববার (৮ নভেম্বর) ৫৫তম জাতীয় সমবায় দিবস উপলক্ষে জকিগঞ্জ উপজেলা মিলনায়তনে আয়োজিত আলোচনা সভায় সমবায়ের সম্ভাবনা ও এ খাতের জবাবদিহির বিষয়টি আলোচনায় আসে। ‘করবো সমবায়, গড়ব দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা সমবায় কার্যালয় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আবুল হাসান। তাঁকেও অনুষ্ঠানে একজন সমবায়ী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। সভাপতিত্ব করেন ইউএনও সুজিত কুমার চন্দ।

৫০ হাজার টাকা ফেরত চেয়ে আবেদন :

সোনার বাংলা বহুমুখী সমবায় সমিতিতে জমা রাখা সঞ্চয়ের টাকা ফেরত চেয়ে গত ২৯ অক্টোবর ইউএনওর কাছে লিখিত আবেদন করেন গঙ্গারজল গ্রামের বাসিন্দা সুহেল আহমদ।

আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর স্ত্রী সমিতিটির ১০ বছর মেয়াদি মাসিক সঞ্চয় প্রকল্পের সদস্য। প্রতি মাসে দুই হাজার টাকা করে কিস্তি জমা দিতেন তিনি। সঞ্চয় বইয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত তাঁর স্ত্রীর নামে মোট ৫০ হাজার ১০০ টাকা জমা হয়েছে।

সুহেল আহমদের ভাষ্য অনুযায়ী, পারিবারিক আর্থিক সমস্যার কারণে নিয়মিত কিস্তি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। এ অবস্থায় সমিতির নিয়ম অনুযায়ী জমা করা টাকা উত্তোলনের আবেদন করেন তাঁরা। কিন্তু দীর্ঘদিন পার হলেও টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি। একাধিকবার সমিতির কার্যালয়ে যোগাযোগ করেও কোনো কার্যকর সমাধান পাননি।

আবেদনে আরও বলা হয়, পরিবারের কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের টাকা ফেরত না পেয়ে তাঁরা আর্থিক সংকটে পড়েছেন। বিষয়টি তদন্ত করে সমিতির বিধি ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাঁর স্ত্রীর জমা করা টাকা ফেরতের ব্যবস্থা নিতে ইউএনওর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি। সুহেল আহমদের দাবি, তাঁর মতো আরও সদস্য একই ধরনের ভোগান্তিতে রয়েছেন। তবে অন্য সদস্যদের সংখ্যা ও তাঁদের পাওনা অর্থের পরিমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সোনার বাংলা বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি জাফরুল ইসলাম বলেন, সঞ্চয়ী হিসাবের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে কোনো সদস্যকে টাকা দেওয়ার নিয়ম নেই। অভিযোগকারীর স্ত্রীর সঞ্চয় প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালে পূর্ণ হবে। তাই মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে টাকা ফেরত দেওয়ার সুযোগ নেই।

সমিতির আর্থিক অবস্থা ব্যাখ্যা করে জাফরুল ইসলাম বলেন, সমিতির প্রচুর মূলধন ঋণ হিসেবে মাঠপর্যায়ে রয়েছে। এ ছাড়া সমিতির নামে অনেক জমি কেনা হয়েছে। কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে এসব জমি বিক্রি করা যাচ্ছে না, আবার নামজারিও করা সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, এসব জটিলতা নিরসনের জন্য জাতীয় সমবায় দিবসের অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য মুফতি আবুল হাসানের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেছেন তাঁরা। ইউএনওও সমিতির প্রতিনিধিদের নিয়ে বসে আলোচনা করার কথা জানিয়েছেন।

তবে সমিতির কাছে সদস্যদের মোট কত টাকা জমা রয়েছে, বর্তমানে কত টাকা ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে, জমি কেনার পেছনে কত অর্থ ব্যয় হয়েছে এবং সদস্যদের পাওনা পরিশোধে সমিতির আর্থিক সক্ষমতা কতটুকু, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

আট বছর আগেও উঠেছিল অনিয়মের অভিযোগ :
পুরোনো সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৮ সালেও সোনার বাংলা বহুমুখী সমবায় সমিতির আর্থিক কার্যক্রম ও নেতৃত্ব নিয়ে গুরুতর অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছিল।

ওই বছরের ২৯ আগস্ট ‘ক্রাইম সিলেট’ নামের একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে ‘জকিগঞ্জ সোনার বাংলা বহুমুখী সমিতির অর্ধকোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. আব্দুশ শহিদ তৎকালীন সভাপতি মো. জাফরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে ২১ আগস্ট দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন।

প্রতিবেদনে অভিযোগের বরাত দিয়ে বলা হয়, সমিতির অনুমোদন ও কার্যকরী কমিটির সিদ্ধান্ত ছাড়াই ঋণ বিতরণ, ব্যক্তিগত কাজে সমিতির অর্থ ব্যবহার, হিসাবের গরমিল এবং সদস্যদের শেয়ারসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ ছিল। সমিতির অর্থে জমি কেনা ও ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে লেনদেনের অভিযোগও করা হয়েছিল।

একই সংবাদমাধ্যমে ওই বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযোগের পর ১০ সেপ্টেম্বর সিলেটের জেলা প্রশাসক তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জকিগঞ্জের ইউএনওকে লিখিত নির্দেশ দিয়েছিলেন। টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে কয়েকজন সদস্য হয়রানির শিকার হয়েছিলেন এবং কাউকে কাউকে ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবের চেক দেওয়া হয়েছিল বলেও ওই প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়।

তবে ২০১৮ সালের প্রতিবেদনগুলোতে অর্থ আত্মসাতের অঙ্ক নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। কোথাও অর্ধকোটি টাকা, আবার কোথাও ১৫ কোটি টাকার সম্পদ ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের কথা বলা হয়। এসব অভিযোগের চূড়ান্ত তদন্তের ফলাফল, মামলা কিংবা বিচারিক নিষ্পত্তি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই পুরোনো অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে ওই সময় প্রশাসনিক তদন্তের নির্দেশের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, সেটিও স্পষ্ট নয়।

উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. ফখর উদ্দিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জকিগঞ্জ উপজেলায় নিবন্ধিত সমবায় সমিতির সংখ্যা ৭৪টি। এর মধ্যে ৫৪টি সক্রিয়। এসব সমিতির মধ্যে পাঁচটি সঞ্চয় ও ঋণদান কর্মসূচি পরিচালনা করে। তবে সোনার বাংলা বহুমুখী সমবায় সমিতি ছাড়া বাকি চারটি বর্তমানে সক্রিয় নয়।

অর্থাৎ উপজেলায় সঞ্চয় ও ঋণদান কার্যক্রম পরিচালনাকারী পাঁচটি সমিতির মধ্যে বর্তমানে চালু রয়েছে মাত্র একটি। তবে নিষ্ক্রিয় চারটি সমিতির কাছে সদস্যদের কোনো পাওনা রয়েছে কি না, সেসব সমিতির আর্থিক দায়দেনা কত এবং সদস্যদের সঞ্চয়ের কী অবস্থা, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ পরিস্থিতিতে সঞ্চয় ও ঋণদান কার্যক্রম পরিচালনাকারী সমিতিগুলোর আর্থিক হিসাব নিয়মিত নিরীক্ষা করা হচ্ছে কি না, সদস্যদের আমানত যথাযথভাবে সংরক্ষিত আছে কি না এবং ঋণ বিতরণ ও আদায়ের হিসাব কতটা স্বচ্ছ, সেসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।

সমবায় সমিতির নিবন্ধন নিয়ে সঞ্চয় সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন ও বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করাও জরুরি। বিশেষ করে সদস্যদের জমা করা অর্থের বিপরীতে সমিতির সম্পদ ও দায়দেনার প্রকৃত হিসাব জানা না থাকলে ভবিষ্যতে অর্থ ফেরত নিয়ে আরও জটিলতা তৈরি হতে পারে।

জবাবদিহি ও আমানত ফেরতের প্রশ্ন :
সমবায় মানুষের সম্মিলিত সঞ্চয়, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের একটি কার্যকর মাধ্যম। জকিগঞ্জের কৃষি, মৎস্য, পশুপালন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরিতে এ খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সমবায়ের নামে অর্থ সংগ্রহের পর সদস্যরা নিজেদের জমা করা টাকা ফেরত না পেলে এ ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সোনার বাংলা বহুমুখী সমবায় সমিতির বর্তমান সভাপতি বলছেন, সদস্যদের সঞ্চয় প্রকল্পের মেয়াদ পূর্ণ হয়নি এবং সমিতির বড় অঙ্কের মূলধন ঋণ ও জমিতে বিনিয়োগ করা রয়েছে। অন্যদিকে অভিযোগকারী পরিবারের দাবি, আর্থিক সংকটের কারণে তাঁরা জমা করা অর্থ ফেরত চেয়েও পাচ্ছেন না। এ দুই অবস্থানের মধ্যে প্রকৃত আর্থিক পরিস্থিতি জানতে সমিতির নিরীক্ষিত হিসাব, সম্পদের মালিকানা, ঋণের পরিমাণ, সদস্যদের আমানত ও দায়দেনার বিস্তারিত তথ্য পর্যালোচনা প্রয়োজন।

বিশেষ করে ২০১৮ সালে একই প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রকাশিত অভিযোগের পর কী তদন্ত হয়েছিল, তার ফলাফল কী এবং বর্তমানে সমিতির আর্থিক অবস্থার কী পরিবর্তন হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

সদস্যদের জমা করা অর্থ ফেরতের ক্ষেত্রে সমিতির বিধি ও চুক্তির শর্ত কী বলছে, তা যাচাইয়ের পাশাপাশি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং সদস্যদের পাওনা পরিশোধের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

জাতীয় সমবায় দিবসে সবার জন্য সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হলেও বাস্তবে সমবায়ের নামে মানুষের কষ্টার্জিত সঞ্চয় অনিশ্চয়তায় পড়লে সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন। তাই শুধু দিবস উদ্‌যাপন নয়, সমবায়ের আর্থিক স্বচ্ছতা, নিয়মিত নিরীক্ষা, প্রশাসনিক তদারকি ও সদস্যদের আমানত সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
ফেইসবুক কমেন্ট অপশন
এই বিভাগের আরো খবর
পুরাতন খবর খুঁজতে নিচে ক্লিক করুন


আমাদের ফেসবুক পেইজ