রবিবার, নভেম্বর ৮, ২০ ২৬
ড্রীম সিলেট ডেস্ক
৬ জুন ২০ ২০
৭:১৬ অপরাহ্ণ

অসাম্প্রদায়িক সম্প্রতির অনন্য নজীর
কমলগঞ্জে মুসলমান ও হিন্দু পরিবার একইসুঁতই বাঁধা জীবন যাত্রা 

আসহাবুল ইসলাম শাওন,কমলগঞ্জ থেকে:: মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় বন্ধুত্বের সর্ম্পকের কারনে মুসলমান ও হিন্দু দুই পরিবার দীর্ঘ ১০ বছর ধরে একইসুঁতই বাঁধা জীবন যাত্রা অব্যাহত রেখেছে। তাদের অটুঠ বন্ধনের জীবন যাত্রা এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রতির একক অনন্য নজীর স্থাপন করেছে। তাদের এই মেল বন্ধন এলাকায় প্রসংশা কুঁড়িয়েছে।
শনিবার দুপুরে কমলগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ভেড়াছড়া গ্রামে গিয়ে ঐ মুসলমান ও হিন্দু দুই পরিবারের সদস্যদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার শরিফপুর ইউনিয়নের নমুজা গ্রামের প্রয়াত সাহেদ মিয়া তার পরিবার পরিজন নিয়ে বিগত ২০০১ সালের প্রথম দিকে কমলগঞ্জ উপজেলার পতনঊষার ইউনিয়নের লক্ষীপুর গ্রামে জমি কিনে বসবাস শুরু করেন। গ্রামের প্রতিবেশী হিসাবে পরিচয় ও সম্পর্ক গড়ে উঠে নারায়ণ দেবনাথের পরিবারের সাথে। পারিবারিক সম্পর্কের কারণে পরিচয় ঘটে, নারায়ণ দেবনাথের মেয়ের জামাতা ক্ষিতিশ দেবনাথ পূণের সাথেও। সেই সুবাদে ক্ষিতিশ দেবনাথ ও সাহেদ মিয়ার সম্পর্ক গভীর হতে থাকে,এক সময় দুজনার সম্পর্কটি বন্ধুত্বে রূপ নেয়। আর সেই বন্ধুত্বের কারণেই দুজনে সিদ্ধান্ত নেয়, দুজনেই এক জায়গায় বসবাস করবে । যদিও সাহেদ মিয়া এই পৃথিবীএখন আর বেঁচে নেই,তবুও তাদের ২ পরিবারের বন্ধুত্ব রয়েছে এক সুঁতোই গাঁথা।
প্রয়াত সাহেদ মিয়ার ভ্রাতুসপুত্র মোঃনজরুল ইসলাম জানান, ২০১০ সালে আমার পিতা মোঃ শফিক আলী ও প্রয়াত চাচা সাহেদ মিয়া পতনঊষার ইউনিয়নের লক্ষীপুর গ্রামের জমিজমা বিক্রি করে কমলগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ভেড়াছড়া দুর্গম পাহাড়ি গ্রামে এসে জমি কিনে বাড়ি তৈরী করে সেখানেই বসবাস শুরু করেন। পরে আমার চাচা ক্ষিতিশ দেবনাথ ও তার পরিবারকে নিয়ে আসেন এখানে। কিন্তু  ক্ষিতিশ দেবনাথের আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায়, একই স্থানে তার পরিবারকেও থাকার জন্য একটি ঘর তৈরি করে দেয়া হয়। চাচা মারা গেলেও এখন পর্যন্ত ক্ষিতিশ দেবনাথ ও তার পরিবারটি আমাদের সাথে রয়েছে।
ক্ষিতিশ দেবনাথ এর সাথে আলাপকালে তিনি জানান,আমার আদি নিবাস মৌলভীবাজারের সদর উপজেলার নাজিরাবাদ ইউনিয়নের ঝাকান্দি এলাকায়। সেখানে ৩ শতকের ভুমিতে পিতা সুরেশ দেবনাথ ও আমরা ৮ ভাই বোন নিয়ে বসবাস করতাম। বিয়ের পর সংসার বড় হয়ে যাওয়ায় সেখানে তাকতে কষ্ট হতো। তাই কিছুদিন শশুড় বাড়িতে স্ত্রী সন্তান নিয়ে থাকা অবস্থায় সাহেদের সাথে পরিচয় ও সম্পর্ক গড়ে উঠে। নিজের আত্ম সম্মান রক্ষার স্বার্থে শ্বশুরবাড়ি না থেকে পরিবার নিয়ে বেড়িয়ে আসার চিন্তা ছিলো সবসময়। তখন বন্ধু সাহেদের কথায় শশুড়বাড়ি ছেড়ে ভেড়াছড়া দুর্গম পাহাড়ি এই এলাকায় চলে আসি। কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে বসবাসের জন্য কোন বসতভিটা ক্রয় করতে পারেননি। সাহেদের পরিবারের মানবিকতার কারণে হিন্দু হয়েও এই মুসলিম পরিবারের সাথে দীর্ঘ ১০ বছর যাবত একসাথে বসবাস করে আসতেছি। সাহেদ বেঁচে নেই তারপরও ২ পরিবারে এখন পর্যন্ত কোন বিপত্তি ঘটেনি। 
ক্ষিতিশ দেবনাথের সহধর্মিণী অঞ্জলি দেবী বলেন, আমরা এখানে ১০ বছর যাবত ধরে বসবাস করছি। আমরা আমাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্টান ,পূজা-অর্চনা এখানেই পালন করি। কোন সমস্যা হয়নি। অঞ্জলি দেবীর সাথে আলাপকালে তিনি আরো জানান, ৪ জনের অভাবী সংসার বড় ছেলে পলাশ দেবনাথ এবার আহমদ ইকবাল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস,এস,সি পাশ করেছে, মেয়ে শিখা রাণী একই বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণীতে পড়ছে। খরচ চালাতে কষ্ট হয় বিধায় ছেলে পলাশ দেবনাথকে মামার বাড়ি লক্ষীপুরে পাঠিয়েছেন। কথা হয় নজরুলের মা সইফা বেগমের সাথে তিনি বলেন, আমার ৩ ছেলে ও ১ মেয়ের সাথে বর্তমানে অঞ্জলিকে আমার বড় মেয়ে হিসাবে মেনে নিয়েছি। এদিকে ক্ষিতিশ দেবনাথের সংসার চলে পাহাড়ে ও গ্রামে দিনমজুরের কাজ করে। কর্ম করে যা আয় করেন পরিবার ও ছেলে মেয়ের লেখাপড়ায় চলে যায়। টাকা উপার্জন করে বসতভিটা ক্রয় করবেন বলে  ১০ বছর পেড়িয়ে গেলেও হয়নি নিজের একটু মাথা গোছার ঠাঁই। ক্ষিতিশ দেবনাথ সংক্রমণ করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাব হওয়ায় বর্তমানে কোন কাজকর্ম করতে পারছেন না। এক বাড়িতে হিন্দু মুসলিম মিলেমিশে চলছে নেই কোন ঝামেলা। আত্মীয় স্বজনের মতোই চলাফেরা করেন পরিবার দুটি, কেউ বুঝতে পারে না দুুুই ধর্মের মানুষ। সত্যিই এ যেনো অসাম্প্রদায়িকতার এক মেল বন্ধন। এক বাড়িতে দুই ধর্মের অনুসারী, কেউ আল্লাহ আবার কেউ ভগবান ঢাকছেন। হঠাৎ কেউ গেলে বুঝতে পারবেন না এখানে দুই সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। অবাধে একজন আরেকজনের ঘরে আসা যাওয়া করছেন এমন মধুর সম্পর্কের কাছে সাম্পপ্রদায়িকতা যেনো নতি স্বীকার করেছে। বিশিষ্ট জনেরা মনে করেন এটি অসাম্প্রদায়িকতার একটি আর্দশ, এখান থেকে সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদীদের শিক্ষা নেওয়া উচিৎ। ক্ষিতিশ দেবনাথ ও নজরুল ইসলাম কেবল মানবিকতাকে মূল্যায়ণ করেছেন, তাদের কাছে সাম্প্রদায়িকতা কিছুই নয় মানবতাই ধর্ম ।
 

ফেইসবুক কমেন্ট অপশন
এই বিভাগের আরো খবর
পুরাতন খবর খুঁজতে নিচে ক্লিক করুন


আমাদের ফেসবুক পেইজ