বুধবার, ফেব্রুয়ারী ৪, ২০ ২৬
শরীফ আহমদ, দক্ষিণ সুরমা::
৩ ফেব্রুয়ারী ২০ ২৬
৪:১২ অপরাহ্ণ

সিলেট-৩ আসন, দক্ষিণ সুরমা সমীকরণ বিএনপি ও ইসলামী ঐক্যজোটের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা

সুরমা, কুশিয়ারা নদী আর হাকালুকি হাওর বেষ্টিত তিন উপজেলা দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ নিয়ে সিলেট-৩ সংসদীয় আসন। সম্ভাব্য প্রার্থীদের পদচারণায় সরগরম এখন নির্বাচনী এলাকা। দীর্ঘ দিনে আসনটিতে দেশ ও প্রবাসে নির্যাতিত ও ত্যাগী অনেকেই মনোনয়ন প্রত্যাশায় কাজ করছেন। আর বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে মাঠে ছিলেন হাফ ডজন নেতা। সব জল্পনা কল্পনা শেষে কেন্দ্রীয় বিএনপি’র চুড়ান্ত করলো তাদের মনোনীত প্রার্থী।

গত ৩ নভেম্বর-২০২৫ সোমবার সন্ধা ছয়টায় ঢাকাস্থ গুলশান কার্যালয়ে বিএনপি চুড়ান্ত মনোনীত প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ঘোষণার পর থেকে মাঠে কাজ করে যাচ্ছে ৩ আসনের মনোনীত প্রার্থী আব্দুল মালেক। ২২ জানুয়ারি থেকে সিলেট-৩ নির্বাচনী এলাকায় চুড়ান্ত প্রার্থী তালিকায় ৬ জন প্রার্থী রয়েছেন নির্বাচনী লড়াইয়ে।

এর মধ্যে দলীয় প্রার্থী রয়েছেন ৪ জন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ২ জন। তারা হলেন- বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি প্রার্থী আব্দুল মালেক (ধানের শীষ), জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ আতিকুর রহমান (লাঙ্গল), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা মুসলেহ উদ্দীন রাজু (রিকশা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী রেদওয়ানুল হক চৌধুরী (হাতপাখা), স্বতন্ত্র প্রার্থী মোস্তাকিম রাজা চৌধুরী (ফুটবল) ও মইনুল বাকর (কম্পিউটার)।

সিলেট-৩ নির্বাচনী এলাকা। এ আসনে মোট ভোটার রয়েছেন ৪ লাখ ১৫ হাজার ৯৬৬ জন। এর মধ্যে দক্ষিণ সুরমা উপজেলায় সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ৬টি ওয়ার্ড (২৮, ২৯, ৩০, ৪০, ৪১ ও ৪২) ও ৮টি ইউনিয়ন পরিষদ নিয়ে মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ২০ হাজার ৬৫৮ জন, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় ৫টি ইউনিয়ন পরিষদ নিয়ে মোট ভোটার সংখ্যা ৯৩ হাজার ৩৯০ জন ও বালাগঞ্জ উপজেলায় ৬টি ইউনিয়ন পরিষদ নিয়ে মোট ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ১ হাজার ৯১৮ জন। দক্ষিণ সুরমা মোট ভোটকেন্দ্র ৭৯টি, ভোট কক্ষের সংখ্য ৪৬০টি। আর মাত্র ১০ দিন বাকী। সিলেট-৩ আসনে নির্বাচন মাঠ গরম করছেন বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল মালেক ও ইসলামী ঐক্যজোটের মাওলানা মুছলেহ উদ্দিন রাজু।

এদিকে যোগাযোগ মাধ্যমেই প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রেজাওয়ানুল হক চৌধুরী রাজু ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আলহাজ্ব আতিকুর রহমান। বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা শুরু হয়েছে বৃহস্পতিবার থেকে। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে সিলেট-৩ আসনে ইতোমধ্যেই জমে উঠেছে বহুমুখী রাজনৈতিক লড়াই।

এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেবল দলীয় শক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আদর্শিক অবস্থান, সাংগঠনিক সক্ষমতা, স্থানীয় প্রভাব এবং সাধারণ ভোটারের মন-মানসিকতা, সবকিছু মিলিয়েই নির্ধারিত হবে ফলাফলের সমীকরণ। ৬ জন প্রার্থীর এই লড়াইয়ে কে কতটা এগিয়ে, কারা ভোটের সমীকরণ বদলে দিতে পারেন, সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পর্যন্ত। দীর্ঘদিনের বিরোধী রাজনীতির মুখ বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল মালেক। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সিলেট-৩ আসনে সবচেয়ে আলোচিত নাম বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল মালেক। বিগত সরকারবিরোধী আন্দোলনে প্রবাসের মাটিতে অবস্থান করেও দলের পতাকা উঁচু রেখে বহির্বিশ্বে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন আব্দুল মালেক। বারবার নির্বাচনী মাঠে লড়ে চলছেন জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ আতিকুর রহমান।

জাতীয় পার্টির এই প্রার্থী সিলেট-৩ আসনের একজন বহুল পরিচিত মুখ। গত কয়েকটি সংসদ নির্বাচনেই তাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেখা গেছে, তবে ব্যাপক পরিচিতি থাকলেও নির্বাচনী ফলাফলের বিচারে তিনি এখনো সফলতার মুখ দেখেননি। ভোটের মাঠে বারবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও দৃশ্যমান সাফল্য অধরা থেকেছে তার জন্য। অতীতে জাতীয় পার্টি বিভিন্ন নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও সাম্প্রতিক সময়ে দলটির সাংগঠনিক শক্তি ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে মোহাম্মদ আতিকুর রহমানের উপস্থিতি সিলেট-৩ আসনের নির্বাচনী লড়াইয়ে একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।

বড় দলগুলোর পাশাপাশি তার অংশগ্রহণ এই আসনের রাজনৈতিক বৈচিত্র্য ও কৌশলগত হিসাবকে আরও পূর্ণতা দিচ্ছে। পূর্ব পরিচিতি কাজে লাগানোর চেষ্টায় রয়েছেন মোহাম্মদ আতিকুর রহমান। মোগলাবাজার থানা জাতীয় পার্টির আহবায়ক শহীদ আহমদ জানান, দলীয় বিভক্তি কারণে নির্বাচন প্রচারণায় অনেকেই অংশ করছেন না। তবে ৮ ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের নির্বাচনী কাজে অংশ গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। আলেম পরিবারের উত্তরাধিকার ও জোটের প্রতিনিধিত্ব করছেন মাওলানা মুসলেহ উদ্দীন রাজু। উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম হাফিজ মাওলানা নূরউদ্দীন আহমদ গহরপুরী (রহ.)-এর সন্তান মুসলেহ উদ্দীন রাজু।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী হিসেবে সিলেট-৩ আসনে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির আরেকটি ধারা প্রতিনিধিত্ব করছেন তিনি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ জোটের সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে তিনি এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এটি তার প্রথম অংশগ্রহণ। রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগে তার মূল পরিচয় ছিল একজন হাফেজ ও ইসলামী আলেম হিসেবে, যা ধর্মপ্রাণ ভোটারদের একটি অংশের কাছে তাকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে।

নৈতিক রাজনীতির বার্তা নিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী রেদওয়ানুল হক চৌধুরী। নতুন মুখ হিসেবে সিলেট-৩ আসনে প্রচারণা চালাচ্ছেন তিনি। দলের একক প্রার্থী হিসেবে ধর্মপ্রাণ ভোটারদের একটি অংশের আস্থা অর্জনে তিনি সক্রিয়। নীরব কিন্তু হিসাবযোগ্য স্বতন্ত্র প্রার্থী মোস্তাকিম রাজা চৌধুরী। এই প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিনি। শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে একটি পরিচিতি গড়ে তুলেছেন তিনি।

নির্বাচনী মাঠে নতুন হলেও তার প্রভাবকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। মূলতঃ তার উপস্থিতি ভোট বিভাজনের সম্ভাবনা তৈরি করছে, যা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে এমন নীরব প্রার্থীরাই অনেক সময় অপ্রত্যাশিত ফ্যাক্টর হয়ে ওঠেন প্রবাসফেরত বিকল্প কন্ঠ স্বতন্ত্র প্রার্থী মইনুল বাকর। সুদূর প্রবাস থেকে ফিরে স্বতন্ত্র প্রার্থী মইনুল বাকর দলীয় রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়ে নিজেকে একজন যোগ্য ও বিকল্প প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্ঠা করছেন।

ভোটের মাঠে শেষ কথা বলবে ভোটার। সব মিলিয়ে সিলেট-৩ আসনের নির্বাচন হয়ে উঠেছে একটি বহুমাত্রিক প্রতিযোগিতা-যেখানে বড় দলের আধিপত্য, স্বতন্ত্র প্রার্থীর বিকল্প বার্তা এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অবস্থান, একে অন্যকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে দক্ষিণ সুরমা উপজেলা নির্বাচন অফিসার স্বর্ণালী চক্রবর্তী জানান, দক্ষিণ সুরমায় নির্বাচনের সকল প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়। নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসাদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্বরতদেরও প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।

ফেইসবুক কমেন্ট অপশন
এই বিভাগের আরো খবর
পুরাতন খবর খুঁজতে নিচে ক্লিক করুন


আমাদের ফেসবুক পেইজ