৩:৪১ অপরাহ্ণ
'শিলং তীর'লোভ-ভোগের দীর্ঘ ছায়া
রুবেল আহমদ:: লোভের রাজ্যে অনেকের জীবনই নানারকম বেদনাবিধুর গদ্যময়। লোভ, মোহ, হিংসা, ক্রোধ, কাম এই রিপুগুলোর যে কোনোটিই মানুষকে বিপথে চালিত করতে পারে। প্রলুব্ধ করতে পারে যে কোনো অন্যায় কাজে যুক্ত করতে। উল্লিখিত রিপুগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো লোভ। লোভ শুধু মানুষকে অন্ধই করে দেয় না, মনুষ্যত্বকে পর্যন্ত নির্বাসিত করে। মনীষীরা এই ধ্বংসাত্মক রিপুগুলো থেকে নিজেকে রক্ষা করে চলতে উপদেশ দিয়েছেন। একইসঙ্গে এও প্রসঙ্গক্রমে ওঠে আসে আকর্ষণ, আসক্তি, প্রবণতা ও রোগের মধ্যে কোনটা অধিকতর খারাপ। মনস্তাত্ত্বিকরা তাদের গবেষণালব্ধ ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণে প্রমাণ করেছেন সবচেয়ে খারাপ হলো আসক্তি। কারণ, ওষুধে রোগ সারানো যায় কিন্তু আসক্তি থেকে মুক্ত হওয়া সহজ নয়। আর বাস্তবতার নিরিখে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, লোভের ফাঁদ পেতে মানুষকে বিপথে টানার, সর্বস্বান্ত করার মতো জঘন্য মনোবৃত্তির লোকের সংখ্যা সমাজে ক্রমেই বাড়ছে। এরই খণ্ডিত দৃষ্টান্তের সাক্ষ্য মেলে ২৭ ও ২৮ আগস্ট প্রকাশিত দুটি সংবাদ প্রতিবেদনে।
ভারতের শিলংভিত্তিক একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সপ্তাহের ছয় দিন জুয়াড়িরা নতুন ফন্দি এঁটেছে। ওই দিনগুলোর বিকেলে 'শিলং তীর' নামে পরিচিত এই অনলাইন জুয়া খেলা বা ড্র অনুষ্ঠিত হয়। জুয়াড়িরা ১০ টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দামে তাদের ডিজিটগুলো কেনে। এতে বিজয়ী ব্যক্তি পান ডিজিট কেনার জন্য দেওয়া টাকার ৮০ গুণ। উদ্বেগের বিষয় হলো- এক বা দু'জন বিজয়ী হলেও বাকি সবাই লাভের আশায় প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা খুইয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। অনলাইন জুয়ার এই চক্রের বাংলাদেশি চার এজেন্টকে গ্রেপ্তারের পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ এসব তথ্য জানায়। এই লোভের ফাঁদ ১৯৯০ সালে সিলেটের সীমান্তবর্তী ভারতের শিলং ও গুয়াহাটিতে চালুর পর এক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে সিলেট এলাকায়। এখন এই লোভের তীর দেশের রাজধানী ও সিলেট সহ দেশের বিভিন্ন জেলায় লোভাতুরদের বিদ্ধ করেছে। আড়াই বছর ধরে ঢাকায় চলছিল এই 'শিলং তীর'। জানা গেছে, প্রতিদিন জুয়া খেলতেন দুই শতাধিক মানুষ। 'ক্যাসিনোকাণ্ড' আমাদের দেশের নিকট অতীতের ঘটনা। দেশজুড়ে এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছিল। এনামুল-রূপন-সম্রাটদের মতো এই কাণ্ডের হোতারা ধরা পড়ে। বের হয়ে আসে আরও রাঘববোয়ালের নাম। সেই ঝড় এখন অনেকটাই স্তিমিত। দেশে এভাবেই নেতিবাচক বিষয়গুলো নিয়ে ঝড় ওঠে আবার নেমেও যায়। হয়তো 'শিলং তীর'ও এভাবেই মিইয়ে যাবে।
সমাজে এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়- যাদের কেউ কেউ দেখেন অর্থের লোভ, ক্ষমতার লোভ, কৃতিত্ব জাহিরের লোভ, সম্পত্তির লোভ, সাম্রাজ্যের লোভ ইত্যাদি। মীর মশাররফ হোসেন তার 'বিষাদ-সিন্ধু' গ্রন্থে লোভের ভয়ানক পরিণতির কয়েকটি দিক ফুটে উঠেছে। সর্বনাশা লোভের কারণে মানুষের কী দশা হতে পারে এর খণ্ডচিত্র মেলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'রক্তকরবী' নাটকেও। এই লোভের কারণেই মানুষের সাধুতা, পবিত্রতা, দায়বদ্ধতা ইত্যাদি একেবারে সমূলেই বিনাশপ্রাপ্ত হয়। লোভ থেকে হিংসা-সংঘাত-অশান্তি জন্ম নেয়। বিষাদ-সিন্ধুতেই উল্লেখ রয়েছে 'হায়রে অর্থ! হায় রে পাতকী অর্থ! তুই জগতের সকল অনর্থের মূল।' ক্ষমতার লোভের উদাহরণ তো বিশ্বের দেশে দেশেই আছে। আমরা এও জানি, লোভ নীতি-নৈতিকতা বিসর্জনের পথ সৃষ্টি তো করেই মানুষের অস্তিত্বের মূলে আঘাতের দরজাও খুলে দেয়। 'লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু' কথাটির প্রচলন হয়েছে এসব প্রেক্ষাপটেই। লোভ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির অংশ হলেও যিনি বা যারাই তা সংবরণ করতে পারেন তারা সর্বনাশের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারেন। সমাজে আজ মানবিক মূল্যবোধ ও অবক্ষয়ের যে ধস লক্ষ্য করা যায় এর মূলে লোভ নামক রিপুটির প্রভাব রয়েছে। লোভের ফাঁদে পা দিয়ে অনেকেই অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে সর্বনাশা দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে চলেছেন। তাই লোভ নামক ধ্বংসাত্মক ব্যাধিটির বিনাশে আইনি প্রতিকারের পাশাপাশি সমাজে চাই যূথবদ্ধ প্রয়াস। মনুষ্যত্বের সুরক্ষায় লোভের হাতছানি থেকে নিজেদের সংবরণ করতেই হবে। লোভ-ভোগের ফাঁদ সমাজে সৃষ্টি করে পঙ্কিলতারও। হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার অপপ্রয়াসের পথ যেমন রুদ্ধ করতে হবে, তেমনি প্রতারণার ফাঁদ পাতাকারীদেরও আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক দণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। অর্থের লোভ, চাকরির লোভ, মুনাফার লোভসহ প্রতারণার ফাঁদ ও লোভের নেশার রাশ টেনে ধরতেই হবে। প্রতিদিন নিস্ব হচ্চে শ্রমিক, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে যুবক-তরুন জুয়ার নেশায় আশক্ত হচ্ছে।ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে পরিববার। জুয়ার কারনে বাড়ছে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি সহ নানা অপরাধ। লোভ আর ভোগের লাগাম টানতে হবে।
লেখক: কলামিস্ট, প্রবাসী।