সোমবার, জুলাই ২০ , ২০ ২৬
ড্রীম সিলেট ডেস্ক
১২ অক্টোবর ২০ ১৯
৯:৪৬ পূর্বাহ্ণ

আবরার হত্যাকান্ড জাতির জন্যে লজ্জাজনক

রুবেল আহমদ:: বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যা এক জঘন্য অধ্যায়। পুরো বাংলাদেশ এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার। মানুষ কেঁদেছে। প্রতিবাদ করেছে। নিন্দা করেছে। আমরা ফাহাদকে বাঁচাতে পারিনি। তাঁকে মরতে হয়েছে। মৃত্যু’র কাফেলায় যুক্ত হয়েছে আরো একটি নাম। এই হত্যার নিন্দা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই! আমি আবরার হত্যার বিচার চাইনা। বিশ্বজিৎ হত্যা বিচারের মত আবরার হত্যার বিচার নিয়ে ‘প্রহসন’ হোক, তা চাইনা। চাই, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। চাই,  আইনকে এর নিজস্ব পথে চলতে দেয়ার স্বাধীনতা। নিষ্ঠূরতার অনন্য নজির এ হত্যার সংবাদ পড়ার সময় সংবাদ পাঠক (চ্যানেল ২৪’র ফারাবী হাফিজ) কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। শুনছি, আবরারকে মৃত্যুযন্ত্রণার মধ্যে ফেলে রেখে হন্তকরা ফুটবল খেলা দেখতে গেছে? এ কেমন বর্বরতা? দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, নৈতিকতায় আমরা পিছিয়ে পড়ছি?

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শুধু সরকার প্রধান হিসাবে নয়, মা হিসাবে আবরার হত্যার বিচার করবো। প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাত খুন হয়। আমরা তখন জগন্নাথ হলে, ঘুম থেকে উঠে এ সংবাদ শুনে হতভম্ব হয়ে যাই। খুনি ছাত্রলীগের শফিউল আলম প্রধান ও অন্যরা। বঙ্গবন্ধু কাউকে ছাড় দেননি। সবার সাঁজা হয়। বঙ্গবন্ধু’র মৃত্যু’র পর এদের ছেড়ে দিয়ে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করা হয়, সেটা ভিন্ন ইতিহাস।

ভিন্নমত প্রকাশের জন্যে জীবন দিতে হয়েছে আবরার ফাহাদ-কে। নৃশংস হত্যাকান্ড। হুমায়ুন আযাদ, রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর বাবু, অনন্ত বিজয় দাস, নীলাদ্রি নিলয়, ফয়সাল আরেফিন দীপন,  নাজিমুদ্দিন সামাদ, মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী, শাজাহান বাচ্চু, জুলহাস মান্নান, মাহবুব তনয়, এরাও নিহত হয়েছেন নির্মমভাবে। তাঁরাও ভিন্নমত প্রকাশের জন্যেই মরেছেন। আবরার হত্যা নিয়ে যাঁরা এখন সোচ্চার, মুক্তমনাদের হত্যার পর তাঁরা কি সোচ্চার ছিলেন? যারা এখন বাক-স্বাধীনতার কথা বলেছেন, তসলিমা নাসরিন বা মুক্তমনাদের বাক-স্বাধীনতার পক্ষে কি তখন কথা বলেছেন? আবরার শিবির না হলেও মৌলবাদী ঘরানার লোক। এজন্যে মৌলবাদীরা সোচ্চার। এরা মুক্তমনাদের হত্যায় চুপ ছিলো। সমস্যাটা এই জায়গায়। একটি হত্যায় আপনি খুশি, অন্যটিতে বেজার, তা হয়না। হত্যা, হত্যাই। প্রতিটি হত্যা নিন্দনীয়।

এ হত্যাকাণ্ডের ব্যাপক প্রতিবাদ একটি শুভ লক্ষণ। কিন্তু সবার কি প্রতিবাদ করার নৈতিক অধিকার আছে? যাঁরা মুক্তবুদ্ধির মানুষগুলোকে হত্যার পর চুপ ছিলেন, তাদের কি অধিকার আছে প্রতিবাদ করার? মুক্তচিন্তক তরুণরা তো কেউ আবরারের চাইতে কম মেধাবী ছিলেন না? আবরারের ক্ষেত্রে বেশি প্রতিবাদ হচ্ছে, প্রগতিশীলরা প্রতিবাদ করছেন, একই সাথে মৌলবাদীরা প্রতিবাদ করছেন। আবরারের লাশ ব্যবহার করে ভারত বিরোধী ঝান্ডা তুলে মৌলবাদী গোষ্ঠী পুরাতন ষড়যন্ত্র্রে মেতে উঠেছেন। দেশকে অস্থিতিশীল করার এই অপপ্র্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে হবে বটে। মৌলবাদীরা যাঁরা এখন প্রতিবাদে মাঠে নেমেছেন, তাদের এই ‘সিলেকটিভ মানবতা’ একটি দেশ ও সমাজের জন্যে ক্ষতিকর। আবরার হত্যাকাণ্ডে ভারত বিরোধিতার ঝড় বইছে। যে কারো ভারত বিরোধিতার অধিকার আছে? কিন্তু সেই বিরোধিতা যখন সাম্প্রদায়িক এঙ্গেল থেকে হয়, সমস্যা সেখানে। বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হয়েছে। চুক্তি’র ভেতর-বাইর কেউ জানেনা, কিন্তু ‘চিলে কান নিয়ে গেলো’ বলে সবাই চিলের পেছনে ছুটছেন? 

একটি মহল আবরার ফাহাদ হ’ত্যকাণ্ডকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা এবং এটিকে কেন্দ্র করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে যে, আবরার হ’ত্যাকাণ্ডের ঘটনার পরপরই বুয়েটে সক্রিয় হিযবুত তাহরীর। নিষিদ্ধ ঘোষিত এই সংগঠনটির প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে শক্ত ঘাঁ’টি রয়েছে বলে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা নিশ্চিত করেছে। এর আগেও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে হিযবুত তাহরীর সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে একাধিক শিক্ষার্থীকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তাদের বিরু’দ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। এই মহলটি বলতে চাচ্ছেন, আবরার ভারত বিরোধী মন্তব্য করেছে বলে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। কোথায় যেন দেখলাম, দেশে এখন ৮০% মানুষ মৌলবাদী ও ভারত বিরোধী। তাই যদি হয়, তাহলে তো ছাত্রলীগকে কোটি কোটি মানুষকে মারতে হবে? ছাত্রলীগ কি মানুষ মারার যন্ত্র? আইসিস যখন বিশ্বব্যাপী মানুষ মারে, তখন আপনারাই তো বলেন, ওঁরা প্রকৃত মুসলমান নয়, তাহলে ছাত্রলীগের যাঁরা আবরারকে মেরেছে ওরাও প্রকৃত ছাত্রলীগ নয়?

আবার দেখা যাচ্ছে, প্রায় একই সময়ে দু’টো খুন। একটি আবরার। অন্যটি ময়মনসিংহ কমার্স কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র শাওন ভট্ট্যাচার্য্য, তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। দু’জনই ছাত্র। একজনকে নিয়ে মানুষ প্রতিবাদী। অন্যজনকে নিয়ে টু-শব্দ নেই? শাওনের দুর্ভাগ্য, তিনি ছাত্রলীগের হাতে খুন হন’নি? অথবা তিনি হিন্দু? আচ্ছা, আবরার না হয়ে যদি ‘দিলীপ’ হতো বা এমনকি, একজন মুক্তমনা ‘বোরহান’ হতো তাহলে কি এতটা প্রতিবাদ হতো?  দুটো খুন, পার্থক্য বিস্তর! এটাই বাংলাদেশ। এগার বছরের স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তির শাসনের সুফল এখন ঘরে ঘরে মৌলবাদ? সুখের বিষয়, দীর্ঘদিন হাইবারনেশনে থেকে উঠে দেশের প্রথিত বুদ্ধিজীবীরা এবার একটি সঠিক বিবৃতি দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, ‘কারো হাতে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ জিম্মি থাকতে পারে না’। তারা আরো বলেন, “এক গভীর উৎকণ্ঠা ও অসীম বেদনায় নিমজ্জিত আজ পুরো জাতি। সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে রাজনৈতিক দলের আদর্শবিহীন দেউলিয়া চরিত্র।”

সামাজিক মাধ্যমে কেউ কেউ ঘটনার প্রতিবাদে গণজাগরণ মঞ্চকে মাঠে নামার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁরা হয়তো জানেন না যে, হেফাজতকে খুশি করতে সরকার গণজাগরণ মঞ্চের কোমড় ভেঙ্গে দিয়েছেন। রুমীর মা শহীদ জাহানারা ইমাম’র আন্দোলনের কারণে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্ভব হয়েছিলো। সেই আন্দোলনকেও আওয়ামী লীগ স্তব্ধ করে দিয়েছিলো। আবরার হত্যার দায় সরকারকে নিতে হবে। এভাবে একটি দেশ চলতে পারেনা। আবরার হত্যাকাণ্ডে ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল আর মিলার বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। জাতিসংঘ সুষ্ঠূ বিচার দাবি করেছে। আমরা এখন বুয়েটে ছাত্রলীগের টর্চার সেলের কথা শুনছি? সম্রাটের ক্যাসিনোয় টর্চার সেলের কথা মিডিয়ায় এসেছে। প্রধানমন্ত্রী টিভিগুলোকে লক্ষ্য করে ঠিকই বলেছেন, আপনাদের টিভি ওগুলো দেখেনা? প্রশ্ন হচ্ছে, এসব তথ্য আগে মিডিয়ায় আসেনি কেন? বুয়েটে তো প্রায় সব মিডিয়ার প্রতিনিধি আছেন?

এবার দেখা যাক, আবরার ফাহাদ আসলে কি লিখেছিলেন, যার জন্যে তাকে মরতে হলো? ০৫ অক্টবর ফেইসবুকে আবরার লিখেন (হুবহু): (১). ৪৭-এ দেশভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশে কোন সমুদ্রবন্দর ছিল না। তৎকালীন সরকার ৬ মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করল। কিন্তু দাদারা নিজেদের রাস্তা নিজেদের মাপার পরামর্শ দিছিলো। বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষ দমনে উদ্বোধনের আগেই মংলা বন্দর খুলে দেওয়া হয়েছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ ইন্ডিয়াকে সে মংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য হাত পাততে হচ্ছে। (২). কাবেরি নদীর পানি ছাড়াছাড়ি নিয়ে কানাড়ি আর তামিলদের কামড়াকামড়ি কয়েকবছর আগে শিরোনাম হয়েছিল। যে দেশের এক রাজ্যই অন্যকে পানি দিতে চাই না সেখানে আমরা বিনিময় ছাড়া দিনে দেড়লাখ কিউবিক মিটার পানি দিব। (৩). কয়েকবছর আগে নিজেদের সম্পদ রক্ষার দোহাই দিয়ে উত্তরভারত কয়লা-পাথর রপ্তানি বন্ধ করেছে অথচ আমরা তাদের গ্যাস দিব। যেখানে গ্যাসের অভাবে নিজেদের কারখানা বন্ধ করা লাগে সেখানে নিজের সম্পদ দিয়ে বন্ধুর বাতি জ্বালাব। হয়তো এসুখের খোঁজেই কবি লিখেছেন: “পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি/ এ জীবন মন সকলি দাও/ তার মত সুখ কোথাও কি আছে/ আপনার কথা ভুলিয়া যাও।”  এ সামান্য মন্তব্যের জন্যে যদি কাউকে প্রাণ দিতে হয়, তবে এ লজ্জা পুরো জাতির।

লেখক: কলামিস্ট, প্রবাসী।

ফেইসবুক কমেন্ট অপশন
এই বিভাগের আরো খবর
পুরাতন খবর খুঁজতে নিচে ক্লিক করুন


আমাদের ফেসবুক পেইজ