১:৩৩ অপরাহ্ণ
স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ
সিলেটে বছরজুড়ে আলোচিত যত হত্যাকান্ড
শেখ আব্দুল মজিদ:: মানুষের জীবন থেকে বিদায় নিল একটি বছর। সুখ দুঃখের আলোচিত বছর ছিল ২০১৯ সাল। নানান কারণে আলোছিল ছিল বছরটি। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের আন্দোল ছিল সবচেয়ে আলোচিত। যে আন্দোলন বিশ্ব জুড়ে আলোচিত হয়েছিল। বিশ্বের বিভিন্ন প্রত্রিকায় ফলো করে নিউজ করে বাংলাদেশ শিক্ষার্থীদের সড়ক নিয়ে সংস্কার আন্দোলন। বদলে গেলো ক্যালেন্ডার, শুরু হলো নতুন চ্যালেঞ্জের পথযাত্রা।
এ বছর সিলেটজুড়ে বিরাজমান ছিলো কতো ঘটনা-দুর্ঘটনা, হাসি কান্না বিষাদ উত্তেজনা। সব কিছুকে ছাপিয়ে নতুনের বার্তা নিয়ে পূর্ব দিগন্তে উদিত হবে ইংরেজী নববর্ষের নবপ্রভাতের নবীন সূর্য। বিশ্ববাসী স্বাগত জানাবে ২০২০ সালকে। সিলেটে ২০১৯ সাল একটি ঘটনাবহুল বছর।
সিলেটজুড়ে ‘খুনখারাবি’ ছিলো সবচেয়ে বেশী আতংকের। পাশাপাশি চুরি-ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতন, সড়ক দুর্ঘটনা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক সহিংসতা তো আছেই। মারামারি, হানাহানি, দখলবাজি, পূর্বশত্রুতার জেরে প্রতিশোধ নেয়া, প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে হামলাসহ সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চলেছে সিলেট বিভাগজুড়ে। যা মানুষের মনে নাড়া দিয়েছে।
খুনের তালিকায় রয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, গৃহবধু, বৃদ্ধ, নারী-পুরুষসহ অবুঝ শিশু। এমন পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে ছিলো, ছিলো উদ্বেগ। বলা যায়, ২০১৯ সালে সিলেটে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল শোচনীয় পর্যায়ে। তবে এ অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো ছিলো।
এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনায় সিরিয়াস ও উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। এসব কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনায় দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে। ২০১৯ সালের বেশ কিছু আলোচিত খুনের ঘটনা নিম্নে তুলে ধরা হলো।
১৭ জানুয়ারী : জমি নিয়ে বিরোধের জেরে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে মামাতো ভাইয়ের হাতে এক ফুফাতো ভাই খুন হন উপজেলার টিকাডহর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত আফতাব মিয়া (৩৫) টিকাডহর গ্রামের জব্বার মিয়ার ছেলে। ৩০ জানুয়ারী : ওসমানীনগরে ইউনুস আলী নামের এক ব্যবসায়ীকে মাথা থেঁতলে খুন করা হয়েছে। ওসমানীনগরের ঘটনায় পুলিশ সন্দেহভাজন ৮ জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।
৩১ জানুয়ারী : নগরীর মদিনা মার্কেট এলাকায় এক ব্যবসায়ী খুন হন। মদিনা মার্কেট এলাকায় কামরুল মিয়ার কলোনিতে এ ঘটনাটি ঘটে। নিহত শাহাবুদ্দিন মিয়া দক্ষিণ সুরমার কুচাই সুলতানপুর গ্রামের মৃত তৈয়ব আলীর ছেলে। তিনি মদিনা মার্কেট বাজারে ফলের ব্যবসা করতেন। তবে এ ঘটনায় নিহতের ভাই বলছেন, পরিকল্পিতভাবে শাহাবুদ্দিন মিয়াকে হত্যা করা হয়েছে।
২১ ফেব্রুয়ারী : নগরীর শিবগঞ্জ খরাদি পাড়ায় নিজ বাসায় খুন হন তুলা শ্রমিক। নিহত শ্রমিক মেজবাউল হক (৫৫) সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সৈদেরগাওয়ের মৃত মুস্তাক হোসেনের পুত্র। খরাদি পাড়া বৈশাখী ১০৬ নম্বর বাসায় অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা তাকে কুপিয়ে হত্যা করে। মেজবাউল হক খরাদি পাড়া এলাকার একটি তুলার ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন।
২৩ ফেব্রুয়ারী : নগরীর সুবিদ বাজারে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে এক যুবককে হত্যা করে অজ্ঞাত সন্ত্রাসীরা। সুবিদবাজারের নুরানী আবাসিক এলাকার দস্তিদার দিঘির সামনে থেকে পুলিশ ওই যুবকের লাশ উদ্ধার করে। নিহত যুবকের নাম শিমুল দেব। তিনি সুবিদবাজারের মিয়া ফাজিলচিশত এলাকার সমরেশ দেবের ছেলে।
একই দিন সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সাকরপুর গ্রামের সাবুল নম নামের এক তরুণকে রাতে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে খুন করে সন্ত্রাসীরা। পরদিন সকালে উপজেলার আলীরগাঁও ইউনিয়নের কোটাপাড়া নামক স্থান থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা হয়।
২৪ ফেব্রুয়ারী : নগরীতে শাহেদ আহমদ নামের এক স্কুলছাত্র ছুরিকাকাঘাতে খুন হয়। তাঁর বন্ধুরা বাসা থেকে ডেকে নিয়ে আম্বরখানা বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে ছুরিকাঘাত করে। এতে গুরুতর আহত শাহেদকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যায় সে। নিহত শাহেদ আহমদ নগরের চৌখিদেখি ৫৪ নম্বর বাসার আব্দুল খালিকের ছেলে ও হাউজিং এস্টেট ব্রিটিশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৯ম শ্রেণীর ছাত্র।
১২ মার্চ : নগরীতে ছুরিকাঘাতে সাব্বির আহমদ নামে এক তরুণ খুন হন। রাত পৌনে ৮ টার দিকে নগরীর মদীনা মার্কেট এলাকায় ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মখলিছুর রহমানের কার্যালয়ের সামনে এ ঘটনা ঘটে। নিহত সাব্বির ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে তার স্বজনরা জানিয়েছেন। এ খুনের ঘটনায় সাব্বিরের বন্ধুসহ ১৮ জনকে আসামি করে মামলা হয়।
১৫ মার্চ : কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার দরাকুল এলাকায় বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে বদরুল আমিন নামের এক তরুণকে খুন করে অজ্ঞাত সন্ত্রাসীরা। পরদিন সকালে তাঁর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। একইদিন ওসমানীনগরে বন্ধুরা বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে মোস্তাফিজুর রহমান মছু নামের এক কিশোরকে খুন করে। ঘটনার পরদিন স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের মাঠ থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। জীবন নামে মছুর এক বন্ধু আদালতে স্বীকার করেছে তাঁর তিন বন্ধু মিলে মছুকে হত্যা করে।
১৮ মার্চ : ওসমানীনগরের পূর্ব তাজপুর গ্রামে এক প্রবাসীর বাড়ির পানির ট্যাঙ্ক থেকে আনিছ উল্লাহ আনিক নামের এক বৃদ্ধের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতের স্ত্রী আফসা বেগম হাফসা জানিয়েছেন, আগের রাতে আনিককে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায় এক ব্যক্তি।
১ এপ্রিল : প্রেমের দ্বন্দ্বে খুন হন মদনমোহন কলেজের প্রভাষক সাইফুর রহমান। নিখোঁজ হওয়ার একদিন পর তার রক্তাক্ত লাশ দক্ষিণ সুরমার তেলিরাই এলাকায় সড়কের পাশ থেকে উদ্ধার করা হয়। তিনি মদনমোহন কলেজের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক ছিলেন।।
মে ৩১ : নগরীতে আব্দুল আহাদ জামাল (২০) নামের এক যুবককে তাঁরই দুই ‘বন্ধু’ ছুরিকাঘাতে খুন করে। নগরীর শাহপরান গেট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত জামাল শাহপরানের বিআইডিসি বহর কলোনির নজরুল ইসলাম তারা মিয়ার ছেলে।
৮ জুন : পূর্ব বিরোধের জের ধরে সিলেট শহরতলির শিবের বাজারে চাচার হাতে ভাইপো খুন হন। নিহত ভাইপোর নাম দুলাল আহমদ। তিনি স্থানীয় রায়েরগাঁও গ্রামের আবুল বশরের ছেলে।
২২ জুলাই : দক্ষিণ সুরমায় বাড়ির রাস্তা নিয়ে বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষের হামলায় ছালিক মিয়া (৪৫) নামে এক ব্যক্তি খুন হন। দক্ষিণ সুরমার বরইকান্দি ইউনিয়নের চান্দাই গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ছালিক মিয়া একই গ্রামের বাসিন্দা।
২৩ জুলাই : জুতা হারানোকে কেন্দ্র করে সহপাঠির হাতে খুন হন তানভীর হোসেন তুহিন। তিনি গোলাপগঞ্জ উপজেলার হেতিমগঞ্জের কোনাচর দক্ষিণভাগ পলিকাপন গ্রামের মানিক মিয়ার পুত্র ও সিলেট কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের শিক্ষার্থী।
২২ জুলাই : সিলেটের গোলাপগঞ্জে পারিবারিক কলহের জের ধরে স্বামীর হাতে খুন হন স্ত্রী। গভীর রাতে উপজেলার রণকেলী নুরপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত গৃহবধূ মিনারা বেগম। ঘাতক স্বামীর সুন্দর আলীকে আটক করেছে পুলিশ। একই দিন নগরীর করের পাড়ায় জানালার গ্রিলের সাথে গলায় ওড়না পেচাঁনো অবস্থায় দুই সন্তানের জননী ওলি সরকার এর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় নিহতের স্বামী রাতুল সরকারকে আটক করে পুলিশ। এর পূর্বে সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদ ইউনিয়নের আলীনগর গ্রামের আকিব আলীর ২ মাসের কন্যা শিশু সোনিয়া আক্তারকে লাথি মেরে ফেলে দেয় প্রতিপক্ষ। ওই শিশু ওসমানী হাসপাতালে তিনদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর মৃত্যুবরণ করে। এ ঘটনায় জালালাবাদ থানায় মামলাও হয়েছে।
৩ দিনের মাথায় ৫টি খুনের ঘটনায় সিলেটে জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দেয়।
৮ নভেম্বর : নগরের কাস্টঘর এলাকায় ছুরিকাঘাতে অজ্ঞাত পরিচয় এক যুবক (৩০) খুন হন। ওই দিন সন্ধ্যা রাত সাড়ে ৭ টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
৯ ডিসেম্বর : সিলেট সদর উপজেলায় প্রেমলতা বাউরি নামের এক নারী খুন হয়েছেন। তার ছেলে দীপু বাউরি (৩০) লোহার পাত দিয়ে পিটিয়ে তার মাকে খুন করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনার পর থেকে দীপু পলাতক।