সোমবার, জুলাই ২০ , ২০ ২৬
ড্রীম সিলেট ডেস্ক
৫ আগস্ট ২০ ১৯
৯:৩২ পূর্বাহ্ণ

মাদক কারবার ও পুলিশ বাহিনীর সংস্কার

রুবেল আহমদ:: বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করছে পুলিশ বাহিনী। তবে উন্নত বিশ্বে পুলিশ যেভাবে সেবা দেয়, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সেভাবে সেবা দিতে পারে না। ফলে বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে বিভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে। এর পেছনে কিছু ঐতিহাসিক বাস্তবতাও রয়েছে। দুইশ' বছরের ঔপনিবেশিক শাসনামলে পুলিশ সৃষ্টির পেছনে বিদ্যমান ছিল শাসন ও শোষণের যাবতীয় উপাদান। সাধারণ জনতা যাতে স্বাধীনতাকামী হয়ে না ওঠে এবং শোষণের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে না পারে, সে উদ্দেশ্যেই মূলত ব্রিটিশ শাসক গোষ্ঠী ফোর্স হিসেবে পুলিশ গঠন করে। ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনী গঠিত হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে পুলিশ বাহিনীর আমূল সংস্কার হয়নি, ১৮৬১ সালের সেই পুরোনো আইনেই চলছে এ বাহিনী। পুলিশ বাহিনীর সংস্কার প্রস্তাব অনেকবার এলেও তা কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকেছে; কখনও আলোর মুখ দেখেনি। উন্নত বিশ্বে যেখানে পুলিশকে 'পুলিশ অ্যাজ সার্ভিস' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, সেখানে বাংলাদেশ পুলিশ 'পুলিশ অ্যাজ ফোর্স' স্বীকৃতি বহন করে চলেছে।

ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের পর ধারাবাহিকভাবে আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে নতুন অনেক সরকার ক্ষমতায় এসেছে। পুলিশকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে গিয়ে তাদের কেউই পুলিশের সংস্কারের দিকে মনোনিবেশ করেনি। এটি আরও দীর্ঘায়িত হয়েছে ২১ বছরের সামরিক শাসনের কারণে। সামরিক শাসকরা একটি সনাতনী প্রতিষ্ঠানকে সংস্কারের পরিবর্তে ধ্বংসই করেছে- ইতিহাস এমন সাক্ষ্যই দেয়।

উন্নত বিশ্বে পুলিশের যে জবাবদিহি রয়েছে, আমাদের দেশে তা একেবারেই নেই বললেই চলে। এখানে সরকার, অর্থনৈতিক এলিট, সামাজিক এলিট ও রাজনৈতিক এলিটদের সঙ্গে পুলিশের অশুভ আঁতাত থাকে। এর সঙ্গে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজনীতিকীকরণ পুলিশকে গ্রাস করে ফেলেছে। ফলে পুলিশের কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া দুস্কর। উন্নত বিশ্বে পুলিশকে বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছে, বিভিন্ন ধরনের বিশেষায়িত পুলিশ সেবা গঠন করে দায়িত্ব ভাগ করা হয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ যুবক জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ডের ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। উন্নত বিশ্বে পুলিশ শতভাগ স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করে এটা বলা যাবে না, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতি তাদের অনেক বেশি জবাবদিহি থাকে এবং সেখানে শাস্তির বিধান খুবই সাধারণ একটি ঘটনা। বাংলাদেশে পুলিশি কাঠামোয় সংকট রয়েছে। এখানে জনসংখ্যার রেশিও অনুযায়ী পুলিশের সংখ্যা অতি নগণ্য। এ ছাড়া পেশাদারিত্ব, প্রশিক্ষণ ও আধুনিকায়নে অনেক ঘাটতি থাকায় পুলিশ কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারে না। মামলা করতে গিয়ে মানুষ থানায় কী রকম অভিজ্ঞতা সঞ্চার করে, তা আমাদের জানা। অসহায় কেউ কোনো অভিযোগ নিয়ে থানায় গেলে তিনি পুলিশি সাপোর্ট থেকে বঞ্চিত হন। কারণ পুলিশ প্রভাবশালী মহলে সেবা দানে ব্যস্ত থাকে। বাংলাদেশ পুলিশের মধ্যে এই বিষয়গুলো আছে বলে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

গত ৬ জুলাই 'মাদক কারবারে দুই থানার ২০ পুলিশ সদস্য' শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে কারওয়ান বাজার রেললাইন এলাকায় মাদক কারবারের সঙ্গে পুলিশের কয়েকজন সদস্যের সংশ্নিষ্ট থাকার যে তথ্য উঠে এসেছে, তা অনেক নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের একটি অংশমাত্র। আমরা দীর্ঘদিন যাবত ওই এলাকার রেললাইন বস্তিসহ অন্য যে বস্তিগুলোতে এ ধরনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড হতো, সেখানে কোনো না কোনোভাবে পুলিশের সংশ্নিষ্টতা ছিল। কাজেই যতক্ষণ পর্যন্ত পুলিশের কাঠামোগত সংস্কার করা না যাবে এবং জবাবদিহি ও সুশাসন সুদৃঢ় করা না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

বিগত সময়েও মাদকের সঙ্গে পুলিশের সংশ্নিষ্টতার তথ্য সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। ফলে সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করলেও তা বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারওয়ান বাজার রেললাইনে মাদক কারবারের ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ইতিবাচক দিক হলো- পুলিশের ভেতর থেকেই দোষীদের শনাক্ত করা হয়েছে। আমরা এ কাজকে সাধুবাদ জানাই। এই ধারাকে টেকসই করতে কিছু দৃষ্টান্ত স্থাপন করা জরুরি। অপরাধী ছোট-বড় যে পদেই থাকুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা জঙ্গিবাদ দমনে পুলিশের পেশাদারিত্ব ও সাহসিকতা দেখেছি। ১৯৭১ সালে পুলিশের যে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় তাও আমরা জানি। সম্প্রতি পুলিশের একধরনের উন্নয়ন চিত্র লক্ষ্য করছি। এর পেছনে সরকার প্রধানের দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। এ ছাড়া পুলিশের উচ্চস্তরে যারা আছেন তাদের প্রজ্ঞা, দায়িত্বশীলতা ও নেতৃত্বের প্রতি আমাদের আস্থা আছে। কাজেই ঢালাওভাবে যে পুলিশের সমালোচনা করছি তা কিন্তু নয়, আমরা বলছি কাঠামোগত সংস্কার বা উন্নয়ন না হওয়ার ফলেই মূলত এ ঘটনাগুলো ঘটছে।

মাদক আমাদের সমাজের একটি বড় ব্যাধি। সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। তবে সমাজের সর্বস্তর থেকে প্রতিরোধ গড়া না গেলে মাদক ঠেকানো কঠিন হবে। এ জন্য সুশীল সমাজ, অভিভাবক মহলসহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। কমিউনিটি পুলিশিং ধারণা সম্প্রসারণ করা গেলে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়বে। এতে সমাজের ভেতর থেকেই এ ধরনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্দোলন তৈরি হবে। 
লেখক: কলামিস্ট, প্রবাসী। 
 

ফেইসবুক কমেন্ট অপশন
এই বিভাগের আরো খবর
পুরাতন খবর খুঁজতে নিচে ক্লিক করুন


আমাদের ফেসবুক পেইজ