রবিবার, জুলাই ১৯, ২০ ২৬
ড্রীম সিলেট ডেস্ক
২৮ নভেম্বর ২০ ১৮
১২:০ ১ অপরাহ্ণ

এসিড সন্ত্রাস ভয়াবহতা ও প্রতিকার

রুবেল আহমদ:: এসিড সন্ত্রাস বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। প্রতিনিয়ত নারীরা এসিড সন্ত্রাসের শিকার হচ্ছেন। এসিড সন্ত্রাস দমনের জন্য কঠিন আইন থাকলেও এই আইনের ফলাফল খুব একটা ভালো না। পরিসংখ্যান বলছে, আমাদের দেশে এসিড সন্ত্রাসের পরিমাণ কমে আসছে। কিন্তু সংবাদ মাধ্যমগুলোতে প্রতিদিনের শিরোনামে দেশের কোনো না কোনো প্রান্তে এসিড সন্ত্রাসের শিকার হওয়ার ঘটনা চোখে পড়ে।

এসিড সারভাইভাল ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০২ সালে এসিড সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটে ৪৯৪টি, ২০০৩ সালে ৪১৬টি, ২০০৪ সালে ৩২৬টি, ২০০৫ সালে ২২১টি, ২০০৬ সালে ১৮২টি, ২০০৭ সালে ১৬২টি, ২০০৮ সালে ১৪৩টি, ২০০৯ সালে ১২৫টি, ২০১০ সালে ১২০টি এবং ২০১১ সালে ৯১টি। আর ২০১২ সালে আগস্ট মাস পর্যন্ত সারাদেশে ৪৪টি এসিড সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে বলে তাদের পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়।

এই বিপুল সংখ্যক এসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটলেও আইনের ফাঁক গলে কিংবা প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভিক্টিমকে ভয় দেখিয়ে মামলা করা থেকে বিরত রাখা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মামলা হলেও বিচার প্রক্রিয়ায়ও হচ্ছে দীর্ঘসূত্রিতা। অথচ এসিড অপরাধ দমন আইন অনুযায়ী ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে এ মামলা নিষ্পত্তি করার কথা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে এসিড সন্ত্রাসের ঘটনা মোটামুটি স্থিতিশীল। তবে ২০০২ থেকে ২০১০ সালের পরিসংখ্যানে সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমছিল। আবার ২০১০-এর তুলনায় ২০১১ সালে সামান্য বেড়েছে। তবে এসিড অপরাধ মামলার তদারক কমিটির হিসাব বলছে অন্য কথা। তাদের দেয়া হিসাব অনুযায়ী ২০১১ সালে এসিড সন্ত্রাসের ঘটনা বাড়লেও ২০১২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত অপরাধ আবার কমতির দিকে ছিল।

তবে আশার কথা, গত ১০ বছরে এসিড সন্ত্রাসের মামলায় ১৩ জন আসামির মৃত্যুদ- হয়েছে। যদিও এখনো কোনো মৃত্যুদ- কার্যকর হয়নি। এ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদ- হয়েছে ১০২ জনের। অবশ্য অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় বেশির ভাগ মামলায় আসামিরা খালাস পেয়ে গেছে।

২০০২ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ১০ বছরের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এসিড সন্ত্রাসের ঘটনায় সারা দেশে মামলা হয়েছে এক হাজার ৭১৬টি। অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি দাবি করে ৬৭২টি মামলায়(৩৯%) চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। ৪৭৯টি (২৮%) মামলায় আসামিরা খালাস পেয়েছে। আর সাজাপ্রাপ্ত মামলার সংখ্যা মাত্র ১৬৭। বর্তমানে তদন্ত চলছে ৫৫টি মামলার। বাকি ৩৪৩টি মামলা মুলতবি আছে।

এসিড সন্ত্রাস রোধ করার জন্য সমাজের সবাইকে মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে হবে। এসিড সন্ত্রাস রোধের জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন নুরুন্নাহার বেগম। অনেক বাধা-বিপত্তিকে উপেক্ষা করে কাজ করে চলা নুরুন্নাহার বলেন, ‘আমার জীবনে বিপর্যয় নেমে এলেও আমি থেমে যাইনি। আমার সাহস আছে। শুধু আপনারা আমাকে সহযোগিতা করেন।

এসিড সারভাইভল ফাউন্ডেশনের তথ্যানুযায়ী আমাদের দেশে প্রতিমাসে এসিডে ঝলসে যায় দশটি নারীর মুখ। ২০০০-২০১১ সালের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ২০০টির বেশি এসিড ছোঁড়ার ঘটনা ঘটছে। আশার কথা হলো, আমাদের দেশে আগের তুলনায় এসিড সন্ত্রাসের ঘটনা এখন নিম্নমুখী। যেমন মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এবছর জুন পর্যন্ত সারাদেশে এসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে ১৫টি। এই সাময়িক কমতি মানে এই না যে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সময় চলে এসেছে। কারণ আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যাতে আর কেউ এসিড সন্ত্রাসের শিকার না হয়। এসিড সন্ত্রাস বন্ধে এবং এসিড আক্রান্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের জন্য বিভিন্ন সংগঠন এবং এককভাবেও অনেকে অবিরাম কাজ করে চলেছেন। এদের আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলেই আজ এসিড সন্ত্রাসের ভয়াবহতা কমতে শুরু করেছে। তবে এই ধারাবাহিকতা ধরে রেখে এসিড সন্ত্রাসের শেকড় পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে হবে। আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। এসিড সহিংসতায় যেমন সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় নারী সমাজ, তেমনি এসিড আক্রমণকারীর সিংহভাগ হলো পুরুষ। এসিড সন্ত্রাসের ভয়াবহতা, আইনগত শাস্তি, পারিবারিক ও সমাজিক বিপর্যয়ের কথা যদি একজন পুরুষ কিশোর বয়সেই জানতে পারে, তাহলে বড় হয়ে এসিড সন্ত্রাসী দানবে পরিণত হবার সম্ভাবনা অনেকাংশে কমে যায়। পরিসংখ্যান থেকে দেখা গেছে, এসিড সন্ত্রাসের শিকার অধিকাংশ নারীর বয়স ১৮ কিংবা তারচেয়েও কম। তাই নতুন প্রজন্মের তরুণীদের মধ্যে এসিডদগ্ধদের পুনর্বাসন, আইনি সহায়তার বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতনতার বীজ বুনতে পারলে, সময় এলে তারাও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার সাহস পাবে।

লেখক: কলামিস্ট, প্রবাসী।

ফেইসবুক কমেন্ট অপশন
এই বিভাগের আরো খবর
পুরাতন খবর খুঁজতে নিচে ক্লিক করুন


আমাদের ফেসবুক পেইজ