সোমবার, জুলাই ২০ , ২০ ২৬
ড্রীম সিলেট ডেস্ক
১০ নভেম্বর ২০ ১৯
৩:২৭ অপরাহ্ণ

চালের বাজারে লাভের গুড় পিঁপড়ায় খায়

 

রুবেল আহমদ:: নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। বাড়ছে খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের দাম। শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবীর অবস্থা তাই। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সাম্প্রতিক বিবৃতিতে জানা যায়, গত কয়েক বছরের মধ্যে এবার কৃষিপণ্যের মূল্য চড়া। এফএওর মূল্যসূচক থেকে দেখা যায়, গত জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত কৃষিপণ্যের মূল্য ২ শতাংশ বেড়েছে। গত এক বছরে মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ২.২ শতাংশ। বিভিন্ন কৃষিপণ্যের মধ্যে চিনি, তেল ও খাদ্যশস্যের মূল্যবৃদ্ধির হার বেশি উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে খাদ্যশস্যের দাম গত জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত ১.৯ শতাংশ এবং গত এক বছরের ব্যবধানে ৭ শতাংশ বেড়েছে। এর জন্য করোনা পরিস্থিতি দায়ী। তাতে উৎপাদন বৃদ্ধির হার হ্রাস পেয়েছে। কৃষিপণ্যের বিপণন বিঘ্নিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য স্তিমিত হয়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়েছে স্বাভাবিক যোগাযোগ।

বাংলাদেশেও কৃষিপণ্যের মূল্য বেড়েছে। তবে তা যথেষ্ট নিয়ন্ত্রিত। সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও বন্যার কারণেও ফসল বিনষ্ট হয়েছে। তবে দ্রব্যমূল্যের প্রবৃদ্ধিতে এর প্রভাব তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। গত আগস্ট মাসে সার্বিক মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ০.১৫ শতাংশ। সরকারি সংস্থা টিসিবির হিসাবে প্রতি কেজি মোটা চালের দাম বেড়েছে ৪ থেকে ৫ টাকা। এখন বাজারে মোটা চালের দাম প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। মাঝারি চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৬ থেকে ৫০ টাকা দরে। সরু চালের দাম ৫১ থেকে ৬০ টাকা।

তিন মাস আগে বোরো ধান কাটা হয়েছে। সামনে আমন ধানের মৌসুম। মাঝখানে আউশ ধান কাটা হয়েছে। মোটা চাল উৎপাদনে আউশের শরিকানা কম। বাজারে চালের মূল্যের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব গৌণ। স্বাভাবিকভাবেই এ সময় চালের দাম, তরকারির দাম একটু চড়া থাকে। দেশে চালের উৎপাদন গত তিনটি মৌসুমে বেশ ভালো ছিল। মজুদ পরিস্থিতিও ভালো।

প্রশ্ন হচ্ছে, মোটা চালের বাজারদর কত হওয়া উচিত। এর উত্তর পেতে হলে চালের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খরচ ও আন্তর্জাতিক মূল্য বিশ্নেষণ করা দরকার। বর্তমানে মোটা চালের উৎপাদন খরচ প্রতি কেজি প্রায় ৩৫ টাকা। এর সঙ্গে কৃষকের মুনাফা ১৫ শতাংশ যোগ করা হলে প্রতি কেজি চালের মূল্য দাঁড়ায় ৪০ টাকা। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরে চাল আমদানি করে তাতে ব্যবসায়ীর খরচ ও মুনাফা যোগ করা হলে প্রতি কেজি চালের মূল্য দাঁড়াবে প্রায় ৪০ টাকা। কাজেই চালের নূ্যনতম মূল্য প্রতি কেজি ৪০ টাকা হওয়া যুক্তিযুক্ত। এর সঙ্গে চাল কেনার অর্থের ওপর তিন মাসের সুদ, মজুদ খরচ ও ব্যবসায়ীর মুনাফা যোগ করা হলে মোটা চালের বর্তমান মূল্য প্রতি কেজি ৪৫ টাকা তেমন বেশি বলে মনে হয় না।

দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশে চালের মূল্যে মন্দাভাব বিরাজ করেছে। প্রকৃত মূল্যবৃদ্ধির হার ঋণাত্মক। এখন আর ৩০-৩৫ টাকা কেজি দরে চাল কেনার কথা ভাবা ঠিক নয়। তাতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারা উৎপাদনে উৎসাহ হারাবে।

চালের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির জন্য সরবরাহ সংকট দায়ী নয়। এবার চালের মোট উৎপাদন হয়েছে প্রায় তিন কোটি ৮৫ লাখ টন। তার বিপরীতে আমাদের খাদ্য চাহিদা প্রায় তিন কোটি ৫৫ লাখ টন। অর্থাৎ, তাতে উদ্বৃত্ত থাকে প্রায় ৩০ লাখ টন। আন্তর্জাতিক খাদ্য, কৃষি সংস্থাসহ বিভিন্ন বিদেশি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে এবার বড় আকারের খাদ্যশস্য উদ্বৃত্তের ধারণা দিয়েছে। এফএও বলেছে, এবার আমাদের খাদ্যশস্যের উদ্বৃত্ত হচ্ছে প্রায় ২৫ লাখ টন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে বলা হচ্ছে, আগামী নভেম্বর পর্যন্ত এ দেশে চালের কোনো সংকট সৃষ্টি হবে না। ওই সময়ের মধ্যে আমন ধান কাটা হয়ে যাবে। আমনের উৎপাদন ভালো হলে চালের দাম আবার স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

এ ক্ষেত্রে শঙ্কার কারণ যে নেই তা নয়। গত আগস্ট পর্যন্ত পরপর তিন দফা বন্যার কারণে অনেক স্থানে আমনের বীজতলা ডুবে গেছে। বিলম্বিত হয়েছে আমন ধানের উৎপাদন। তাতে ধানের সার্বিক উৎপাদন হ্রাস পেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা সম্পর্কে এখনই জোর দিয়ে কিছু বলা যায় না। উৎপাদন খারাপ হলে ঘাটতি দেখা দেবে। আমাদের নির্ভর করতে হবে আমদানির ওপর।

আমাদের দেশে এবার খাদ্য ঘাটতি নেই। কৃষক ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে চালের মজুদের পরিমাণ ভালো। তবে সরকারি গুদামে মজুদ পর্যাপ্ত নয়। বিভিন্ন গরিব হিতৈষী কর্মসূচিতে কম মূল্যে খাদ্য সরবরাহ করার কারণে এবং অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ কম হওয়ার ফলে তেমন বড় ধরনের মজুদ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। এখন সরকারি গুদামে খাদ্য মজুদের পরিমাণ ১৪.২ লাখ টন। চাল ১১.৩৬ লাখ এবং গম ২.৬৬ লাখ টন। গত বছর এ সময়ের তুলনায় তা দেড় লাখ টন কম।

এবার বোরো ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্ধেকও পূরণ হয়নি। সরকারিভাবে এবার ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল আট লাখ টন। আর চাল ১২.২ লাখ টন। ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংগৃহীত হয়েছে দুই লাখ ১২ হাজার ৭৭২ টন ধান ও ছয় লাখ ৮২ হাজার ৬৮১ টন চাল। অবস্থা সন্তোষজনক নয় বলে ধান-চাল সংগ্রহের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। তাতেও তেমন সুফল হবে বলে মনে হয় না।

এখানে তিন বছর আগে ২০১৭ সালে অবাধে চাল আমদানির পরিণতি বিবেচনায় নেওয়া উচিত। ওই বছর হাওরে আগাম বন্যার কারণে বোরো ধানের উৎপাদন মার খায়। তাতে দেশের অভ্যন্তরে মূল্যবৃদ্ধি ঘটে খাদ্যশস্যের। এ সংকট মোকাবিলা করার জন্য উদার চাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়। আমদানি শুল্ক্ক ২৮ শতাংশ থেকে নামিয়ে ধার্য করা হয় মাত্র ২ শতাংশে। ফলে ২০১৭-১৮ সালে চাল আমদানির পরিমাণ দাঁড়ায় ৪১ লাখ টনেরও বেশি। ২০১৮ সালের বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলনের পর দেশের অভ্যন্তরে ধান ও চালের দামে ধস নামে। তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষক। ফলে ২০১৮-১৯ সালের বাজেটে চালের ওপর আমদানি শুল্ক্ক ২৮ শতাংশে পুনর্বহাল করা হয়। তখন চাল ব্যবসায়ীরা তাদের আমদানিকৃত চাল রপ্তানির সুযোগ চান ভর্তুকি মূল্যে। অর্থাৎ, একবার তারা চাল আমদানি করেছেন প্রণোদনা নিয়ে, এক বছর পর ওই চাল রপ্তানির সুযোগ চেয়েছেন প্রণোদনা নিয়ে। দুই দিক থেকেই লাভ ব্যবসায়ীদের। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দেশের কৃষক ও ভোক্তা। এবার যাতে একই পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

বাজারে চালের দাম বৃদ্ধি পেলে সরকার বিনামূল্যে ও স্বল্পমূল্যে চাল বিতরণ বাড়িয়ে দেয়। এবার তার ব্যত্যয় ঘটেছে। ট্রাকে করে খোলাবাজারে এখন চাল বিক্রি চোখে পড়ে না। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মাধ্যমে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির কার্যক্রম সম্পর্কেও কিছু শোনা যায় না। গত বছর সরকার বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় বিতরণ করেছিল ২১ লাখ টন চাল। এবার বিতরণ করা হয়েছে তার চেয়ে দেড় লাখ টন কম। আম্পান ও বন্যার কারণে এবার মানুষের আয় কম, দারিদ্র্য বেশি। অতএব, সরকারের দারিদ্র্যবান্ধব কর্মসূচি এখন বাড়ানো দরকার।

লেখক: কলামিস্ট, প্রবাসী।

ফেইসবুক কমেন্ট অপশন
এই বিভাগের আরো খবর
পুরাতন খবর খুঁজতে নিচে ক্লিক করুন


আমাদের ফেসবুক পেইজ