রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০ ২১
শবনম শাহনাজ
১২ আগস্ট ২০ ২১
৩:২৬ অপরাহ্ণ

'অতীত দিনের সিলেট' স্মৃতি জাগানিয়া একটি চমৎকার বই: শবনম শাহনাজ
 আমি একটি চমৎকার বই পড়েছি। বইটির নাম ‘অতীত দিনের সিলেট’। আমার বিবেচনায় বইটি চমৎকার এজন্যে যে, এর অনেকগুলো অধ্যায় আমাকে আমার দাদীর মুখে শোনা সিলেটের অতীতের গল্প মনে করিয়ে দিচ্ছিল। ‘পেট্রো-ডলারের দাপট’ অনুচ্ছেদটি পড়ে আমি সেই সময়ের চিত্রটি দেখতে পেলাম। ঐ যে সময়, ষাট সত্তর আশির দশক, যখন লন্ডনীর কদর ছিল না, দুবাইঅলার দাম ছিল। কুয়েতি ভাইসাব পাশ দিয়ে গেলে কী মিষ্টি ঘ্রাণ পাওয়া যেত! তারা আরবি শব্দ মিলিয়ে কথা বলতেন। একদিন একজন ‘তাল তাল’ বললেন তার সাথীকে রাস্তায়। আমি ভাবলাম তাল কেনার কথা বলছে, পরে জানলাম, ‘তাল’ মানে ‘তায়াল’, মানে ‘এদিকে আসো’। দুবাইঅলাদের মানি ব্যাগে নতুন টাকার বান্ডিল দেখতাম। আমি মনে করতাম, বিদেশ থেকে আসার সময় তারা নতুন টাকা মেশিন থেকে বের করে নিয়ে আসতেন স্যুটকেসে ভরে। বইটির এক জায়গায় পড়লাম, ৫০/৬০/৭০ বছর আগে ছাতা যে কী জিনিস ছিল সে-প্রসঙ্গে কিছু কথা। ঐ অংশটা আমাকে ধরে রাখলো শেষ পর্যন্ত। আমার মনে পড়লো, আমরা ছাত্রছাত্রীরা স্কুলে যাওয়া আসার সময় স্যারদের আসতে দেখলে দূর থেকেই ছাতা বন্ধ করে ফেলতাম বেয়াদবি হবে বলে। যদিও একদিন অংকের স্যার বলেছিলেন, ‘তোমরা ছাত্তি বন্ খরিও না আমারে দেখলে’। স্যার খুব দরদি মানুষ ছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টি করতেন। ওই দলের আদর্শ-টাদর্শ বুঝতাম না। কিন্তু আমাদের এই অংকের স্যার যে খুব ভাল মানুষ, সেটা আমরা দেখেছিলাম। সাধাসিধা থাকতেন। হয়ত তিনি ঐ দলের মানুষ বলে না, তাঁর স্বভাবই ছিল এমন। আমরা আমাদের স্কুলজীবনে দেখেছি, নারীরা পর্দা করার জন্যে ছাতা নিয়ে গ্রামের পথে চলতেন। পুরুষ মানুষের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ছাতা কাত্ করে আড়াল করে পাস হতেন। তখন খুব চালাক-চতুর গ্রামের নারীও পুরুষের সামনে পড়লে একদম বোবা হয়ে যেতেন। বইটির লেখক ছাতার দাপটের কথা লিখেছেন। ছাতা-যে আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিল সেসব বেশ প্রাঞ্জল ভাষায় লিখেছেন। দামী ছাতা কমদামী ছাতা দেখে বুঝে নেওয়া হতো ধনী মানুষ না গরীব মানুষ। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাহেবের ছাতার জৌলুসই আলাদা ছিল। হাতে সিকো ফাইভ ঘড়ি চকচক করতো। বইটিতে লেখক বিচিত্র প্রসঙ্গ এনেছেন নিজের স্মৃতি থেকে, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে। তিনি ‘পাঁচ টেকি ডাক্তার’র কথা বলেছেন। টিলাগড়ের সাবাল পীরের কথা বলেছেন। মুসলিম সাহিত্য সংসদের কথা বলেছেন। রিকশার শহর সিলেটের কথা বলেছেন। সেই সময়ের আপেল আঙুরের চাহিদা ও দুষ্প্রাপ্যতার কথা বলেছেন। ‘অসুস্থ মানুষ খেলে সুস্থ, সুস্থ মানুষ খেলে অসুস্থ’ কথাটির মর্ম বুঝে হাসিও পেয়েছে। ‘গৌঢ় গোবিন্দের টিলা ও মুচির দোকান’র কথা লিখেছেন। তাছাড়া, ’আউলিয়াদের মাজার’, ’ইরানি চশমাওয়ালি’ ‘মাছ ধরা পাখি শিকার’ ‘হাতি ভালুক ও সাপের খেলা’ ‘ভূস্বামীদের প্রভাব প্রতিপত্তি’ ‘কলের গানে গান শোনা’ ‘খাদেমের পিআইডিসি’ ‘বহিরাগতদের প্রশংসা’ ‘আউট বই সমাচার’ ‘স্থানীয়দের সাথে বিয়েতে অনীহা’ কাষ্টঘরের মেথরপট্টি’ ‘শুক্রবারের মর্নিং শো সিনেমা’ ‘সীতারাম মিষ্টান্ন ভান্ডার’ ‘যুদ্ধের স্মৃতি’ ‘বিহারী ও জুনাগড়ি সম্প্রদায়’ ‘টাকা বনাম ডলার-পাউন্ড’ ‘ঐতিহাসিক ফরহাদ খাঁ পুল’ ‘ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য ও স্থাপনা’ ‘এমসি কলেজের স্মৃতি’ ‘বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে স্মৃতি’ ইত্যাদি বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা এনেছেন বইটিতে। অনুচ্ছেদের সূচীতে উল্লেখিত অনুচ্ছেদের সংখ্যা অনুযায়ী ২২৭টি বিষয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন লেখক বইটিতে। এতে আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য, আমাদের আনন্দ বেদনার অতীত, আমাদের অজ্ঞতা ও আলোকিত চিন্তার ইতিকথাও রয়েছে। বইটি লিখেছেন সাংবাদিক, কবি, গবেষক, অনুবাদক ও শিক্ষক নিজাম উদ্দীন সালেহ। আমরা জানি, অতীতের কথা মানে কোনো জনগোষ্ঠীর ইতিহাসের কথা, ঐতিহ্যের কথা, সংস্কৃতির কথা, বিশ্বাসের কথা, মূল্যবোধের কথা। বলা হয়- হিস্টরি ইজ দ্য স্টোরি অব হোয়াট উই আর, হোয়ার উই কাম ফ্রম, অ্যান্ড ক্যান পটেনশিয়েলি রিভিল হোয়ার উই আর হেডেড। ইংরেজি কথাটির সহজ বাংলা হয়, ইতিহাস হলো, আমদের পরিচয় ও কোন্ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল থেকে উঠে এসেছি ওসবের গল্প, এবং এ থেকে আমরা কোন্ দিকে যাচ্ছি এর সম্ভাবনাটুকু প্রকাশ পায়। ’অতীত দিনের সিলেট’ বইটি সম্পর্কে আমি জেনেছি আসলে আরেকজন গুণী লেখক সারওয়ার চৌধুরীর রিভিউ পড়ে। তাঁর রিভিউ থেকে কিছু অংশ উল্লেখ করি এখানে- ‘‘কবি আল মাহমুদ লিখেছিলেন, ‘অতঃপর অবশিষ্ট কিছুই থাকে না, জলপ্রিয় পাখিগুলো উড়ে উড়ে ঠোঁট থেকে মুছে ফেলে বাতাসের ফেনা’। থাকে না থাকে না, কিছুই থাকে না। প্রবহমান সময়ে সব কিছু বয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে গেছে কত নগর প্রান্তর স্থলভাগ, কত স্মৃতিস্তম্ভ মুছে গেছে। 'কালের যাত্রার ধ্বনি' কেউ শুনতে পাক বা না পাক, কালের গর্ভে জন্ম মৃত্যুর লীলা চলমানতাবিহীন না। ইতিহাস সচেতন লেখক নিজাম উদ্দীন সালেহ তাঁর পাঠককে জানান, সিলেটের ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য রায়নগরের রাজা গিরিশচন্দ্রের বাড়িটির কিছুই অবশিষ্ট নেই। উল্লেখ্য, রায়নগরের বিখ্যাত জমিদার মানিকচাঁদের পুত্র মুরারীচাঁদের সন্তানহীনা কন্যা ব্রজ সুন্দরী দেবী নিয়েছিলেন গিরিশ চন্দ্রকে দত্তক। ফলে তিনি রায়নগরের জমিদার মুরারীচাঁদের বিশাল সম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন। রাজা গিরিশ চন্দ্র নিজে নিরক্ষর ছিলেন কিন্তু শিক্ষার প্রসারে তিনি সম্পদ ব্যয় করেছিলেন। তিনিই তৎকালীন আসামের প্রথম কলেজ এম.সি. কলেজ (মুরারীচাঁদ কলেজ) ১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এছাড়া তিনি ১৮৮৬ সালে রাজা গিরিশ চন্দ্র হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ব্যক্তি মানুষ বা কোন গোষ্ঠী মরে যাওয়ার কারণেই তার বংশধারা নিশ্চিহ্ন হয় না ঢালাওভাবে। কোনো কারণে মানুষ দেশান্তরে যায়। জন্মভূমি ছেড়ে যেতে হয়। ব্যবসা বা চাকরির জন্যে যায়। কেউ ফিরে কেউ ফিরে না। গ্লোবাল মোবিলাইজেশন হতে থাকে। বাঙালির সন্তান হয় বৃটিশ, আমেরিকান বা কানাডীয়। ভারতীয়ের সন্তান হয় আমেরিকান বা আফ্রিকান বা ইউরোপীয়। এমনও হতে পারে ভারতীয় বংশোদ্ভূত বৃটিশ যার বর্তমান পরিচয়, তার চার/ছয় পুরুষ আগের পুরুষটি বা নারীটি হয়ত বৃটেন থেকেই ভারতে চলে এসেছিলেন একেবারে। অথবা হতে পারে তারই বিশ পুরুষ আগের লোকটি পশ্চিম এশিয়ার বা পশ্চিম আফ্রিকার কোন অঞ্চলের লোক। গবেষণা দেখায় আফ্রিকা থেকেই মানুষ ছড়িয়েছে বিশ্বব্যাপে। নিজাম উদ্দীন সালেহ লিখেছেন, "ষাটের দশকে সিলেট শহরে অনেক বিহারী ও জুনাগড়ির বাস ছিল। এরা ভারত বিভক্তির সময় ভারতের বিহার ও জুনাগড় থেকে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। তারা উর্দুতে কথা বলতেন। শহরের বন্দরবাজারে তাদের অনেক দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল। তারা ভারতীয় মাড়োয়ারিদের মতো জাত ব্যবসায়ী ছিলেন। খুব সামান্য পুঁজি দিয়ে কীভাবে বড়ো ব্যবসায়ী হতে হয়, তা তারা ভালোই জানতেন। সিলেট শহরের মিরাবাজারে দাদাপীরের মাজারের বিপরীতে রাস্তার পাশে এক বিহারী বা জুনাগড়ি পরিবার বাস করতেন।" আসলেই তো। এখন, মানে এ যুগে যুক্তরাজ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বা বিভিন্ন দেশে বাঙালি ভারতীয় পাকিস্তানী অনেকে সেসব দেশে সরকার বা আদালতের উচ্চপদে স্থান পাচ্ছেন তাদের কর্মগুণে। এক সময় তো বৃটেন এ উপমহাদেশ শাসন করেছিল। এখন সেখানে ভারতীয় বাংলাদেশী পাকিস্তানী বংশোদ্ভুত গুণীজনেরা বৃটেন শাসন বিচারের অংশীদার। যদি প্রশ্ন করি, অতীত দিনের কথাপুঞ্জে কী পুঞ্জিভূত থাকে? উত্তরে বলা যায়, থাকে সম্মিলিত স্মৃতিপুঞ্জ ব্যক্তির ও সমষ্টির, এ কথা আমরা বলতে পারি। ব্যক্তি তো আসলে সমষ্টিরই অংশ। ঐ যে কবি বললেন, ‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’। ব্যক্তি ছাড়া সমষ্টি হয় না। সমাজ হতে হলে ব্যক্তির দরকার। আগে এক, পরে দুই, তারপর বহু, তারপর দশ বিশ হাজার লাখ মিলিয়ন বিলিয়ন ট্রিলিয়ন। আবার এতে হিসাব আরেকটি আছে। সেটি হল, সমষ্টির একক। ব্যক্তির একক, পরিবারের একক, সমাজের একক, রাষ্ট্রের একক। এসব সমষ্টিগত একক যুক্তিসংগত কারণেই তৈরি হয়। এসব এককের অপব্যবহারও হয়। কোনো পটভূমিতে এক্সট্রিমিজম জন্ম নেয় এসব এককে। কোন একক এর বিপরীত দিকে অবস্থান নিয়ে থাকে সুনীল আকাশের মতো শান্ত সুন্দর উদার। আমার অনেক স্মৃতি জাগিয়ে দিয়েছে বইটি, যা আমি আসলে ভুলে গিয়েছিলাম। বইটির সার্থকতা এখানে। পাঠকের বিস্মৃত অতীতকে সামনে নিয়ে আসতে পেরেছেন লেখক। বইটির বহু পাঠ হোক। শুনেছি বইটি পাঠকপ্রিয় হয়েছে। বিক্রি হয়েছে ভাল। এটির পরবর্তী খণ্ড আসছে। অপেক্ষায় থাকলাম। লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা ও শুভ কামনা।
ফেইসবুক কমেন্ট অপশন
এই বিভাগের আরো খবর
পুরাতন খবর খুঁজতে নিচে ক্লিক করুন


আমাদের ফেসবুক পেইজ