৭:৫৭ অপরাহ্ণ
সমতল অঞ্চলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয়ের দাবি'
সিলেটে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত
সিলেটে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের আলোচনায় বক্তারা বলেন,বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে (সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ) প্রায় অর্ধশতাধিক ভিন্ন ভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায় বসবাস করে। তবে তাদের মধ্যে জনসংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে প্রধান এবং বৃহৎ দুটি জনগোষ্ঠী হলো খাসি ও মণিপুরি জনগোষ্ঠী। এছাড়া পাত্র, ওরাঁও, গারো, ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মানুষজন বসবাস করেন।
তবে চা বাগান বেষ্টিত সিলেট অঞ্চলে আদিবাসীদের একটি অংশ চা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। এই আদিবাসী জনগোষ্ঠী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সিলেটে বসবাস করছেন। কিন্তু অন্যান্য সমস্যার পাশাপাশি সিলেটে এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে আদিবাসী নারীদের নিরাপদ মাতৃত্ব। রবিবার (৯ই আগস্ট) বেলা ১২টায় আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন উপলক্ষে এথনিক কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (একডো) এর আয়োজনে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভায় নিজেদের সংকটের কথা তুলে ধরেন সিলেটে বসবাসরত আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা।
'আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান: জীবন ও সুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তাদের অবদান' শীর্ষক প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে সিলেট শহরের একটি অভিজাত হোটেলের হলরুমে মতবিনিময় সভা শেষে মনিপুরী ও চা-শ্রমিক শিল্পীদের পরিবেশনায় একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এর পূর্বে সিলেটের দলদলী চা বাগানে একডো ও চা শ্রমিক নারী মঞ্চের উদ্যোগে একটি র্যালি করা হয়।
মতবিনিময় সভার শুরুতেই সভার মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন এথনিক কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (একডো) এর নির্বাহী পরিচালক লক্ষ্মীকান্ত সিংহ।মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, সিলেট অঞ্চলের খাসি, পাত্র, ওরাঁওসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে প্রথাগতভাবে ভূমি ব্যবহার ও সংরক্ষণ করে আসছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি স্বীকৃতি নেই। অবিলম্বে রাষ্ট্রীয় আইনি কাঠামোর মাধ্যমে আদিবাসী জনগোষ্ঠী কর্তৃক প্রথাগতভাবে বসবাস করে আসা এই ভূমির মালিকানা ও ব্যবহারের অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে হবে।
একমাত্র প্রথাগত ভূমির আইনি স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে বন বিভাগ বা প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ভূমি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি বন্ধ করা সম্ভব। তিনি বলেন, সিলেট অঞ্চলে আদিবাসীদের একটি অংশ চা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এলাকা এবং অধিকাংশ চা-বাগানগুলোর কাছাকাছি কার্যকর কোন স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা কমিউনিটি ক্লিনিক নেই। সেখানে পর্যাপ্ত ওষুধ, সার্বক্ষণিক নার্স, দক্ষ ধাত্রী এবং চিকিৎসকসহ কমিউনিটি ক্লিনিক নেই। তাই এখনো এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে আদিবাসী নারীদের নিরাপদ মাতৃত্ব।
এ ছাড়া আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রবীণ, শিশু এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পুষ্টি কর্মসূচি ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজতর করা এখন সময়ের দাবী। আদিবাসী জনগণের মানবাধিকার রক্ষা ও উন্নয়নে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আদিবাসী জনগণকে এমন জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যারা ঐতিহাসিকভাবে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাস করে আসছে, নিজেদের স্বতন্ত্র সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান বজায় রেখেছে এবং মূলধারার জনগোষ্ঠী থেকে ভিন্ন পরিচয় ধারণ করে। একই সঙ্গে তাদের ভূমি, সম্পদ, সংস্কৃতি এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় কার্যকর অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সরকার ইতোমধ্যে ILO Convention 107 এবং UNDRIP 2007-এর পক্ষে সমর্থন প্রদান করেছে। ফলে আদিবাসী জনগণের মানবাধিকার, সাংস্কৃতিক পরিচয়, ভূমির অধিকার এবং উন্নয়নে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ। সবশেষে সভায় উপস্থিত আদিবাসী নেতৃবৃন্দ সমতল অঞ্চলের আদিবাসীদের জন্য একটি পৃথক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার দাবি করেন ।
একডোর সমন্বয়কারী তাসনিম চৌধুরীর সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিলেট প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ইকরামুল কবির,সিলেট প্রেসক্লাবের পাঠাগার ও প্রকাশনা সম্পাদক মো.মুহিবুর রহমান, ডিবিসি নিউজের সিলেট ব্যুরো প্রধান প্রত্যুষ তালুকদার, দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার সিলেট ব্যুরো প্রধান দেবাশিষ দেবু, খবরের কাগজের নিজস্ব প্রতিবেদক শাকিলা ববি, চ্যানেল টুয়েন্টিফোরের সিলেট প্রতিনিধি আজহার উদ্দিন শিমুল প্রমুখ।
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পাত্র সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ছিলেন সুমি পাত্র, মনিপুরী সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে ছিলেন অর্ঘ্য সিংহ, হিমেশ সিংহ, চা শ্রমিক নারী মঞ্চের সভাপতি সুমি নায়েক, লাক্কাতুড়া চা চাগানের নারী ইউপি সদস্য দিপালী গোয়ালা, কেওয়াছড়া চা বাগানের বাসন্তি কুর্মি প্রমুখ।