বুধবার, মে ৬, ২০ ২৬
জাতীয় ডেস্ক::
২২ ডিসেম্বর ২০ ২০
৭:৩৮ অপরাহ্ণ

দুই বছরে কর্তব্যরত ৭২ পুলিশ সদস্যের মৃত্যু
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে (ডিএমপি) কর্তব্যরত অবস্থায় দুই বছরে প্রাণ হারিয়েছেন ৭২ জন পুলিশ সদস্য। এদের মধ্যে ২০১৯ সালে ২৭ জন এবং চলতি বছরে ৪৫ জন মারা গেছেন।

মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে এ বছর পুলিশে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। যারা মারা গেছেন তাদের বেশিরভাগই ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনশীল ব্যক্তি।

আশা-ভরসার অবলম্বন হারিয়ে পরিবারের সদস্যরা দিশেহারা। কারও কারও স্ত্রীর উপার্জনে চলছে সংসার। স্বামীর স্বপ্ন বাস্তবায়নে সংসারের হাল ধরেছেন তাদের স্ত্রীরা।

ডিএমপি সদর দফতর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর কর্তব্যরত অবস্থায় যারা মারা গেছেন তারা হলেন পুলিশ পরিদর্শক রাজু আহম্মেদ, রফিকুল ইসলাম, এসআই এসএম মুকুল মিয়া, রাজিবুল ইসলাম, বজলুর রহমান, রফিকুল ইসলাম, এএসআই জাহাঙ্গীর আলম, নূরুল আলম মজুমদার, কামাল হোসেন, নায়েক আবদুস ছালাম, আল মামুন রশীদ, গোপী চন্দ্র দেবনাথ, কনস্টেবল ইসমাইল হোসেন, কামরুল ইসলাম, ফারুক হোসেন, হারুন অর রশিদ, আনিছুজ্জামান, জসিম উদ্দিন, জালাল উদ্দিন খোকা, আবদুল খালেক, এনামুল হক, আসলাম আলী, আলমগীর হোসেন, আবুল হোসেন আজাদ, আবদুল্লাহ আল মামুন, তৌহিদুল ইসলাম, কাশেম আলী, সিরাজুল ইসলাম, সায়ফুল আলম, কাজী মো. মহসীন, তাজুল ইসলাম, বেলাল হোসেন, নূরে আলম সিদ্দিকী, শেখ টিপু সুলতান, জুলফিকার আলী, মঞ্জুর রহমান, কোরবান আলী, আবদুস সোবহান, অফিস সহকারী কাম কমিম্পউটার অপারেটর নীরোদ চন্দ্র মণ্ডল এবং উচ্চমান সহকারী তরুণ চন্দ্র সরকার।

২০১৯ সালে যারা কর্তব্যরত অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছেন তারা হলেন, শিক্ষানবিশ সার্জেন্ট আসাদুজ্জামান রাজু, টিএসআই নুরুল ইসলাম, এএসআই মোজাম্মেল হক রুবেল, সাখাওয়াত হোসেন, ইমতিয়াজ আহম্মেদ, খায়রুল আলম, নজরুল ইসলাম, দুলাল ওয়াদুদ প্রামাণিক, সহিষ (ঘোড়া চালক) রফিকুল ইসলাম, নায়েক শহিদুল ইসলাম, রিয়াজুল আলম, কনস্টেবল মজিবুর রহমান, শহিদ মিয়া, আবদুর রহিম, এনামুল হক সরদার, রকিবুল হাসান, কাজী শরীফ, আজিজুল হক, আবুল কাশেম, নুর মোহাম্মদ রহমান, শ্রী রবীন্দ্রনাথ মণ্ডল, আবদুল কাদের, আবু জামাল, শহিদুল ইসলাম, মামুন মিয়া এবং সেহায়েত হোসেন শেখ।

ডিএমপি সূত্র জানায়, উত্তরা তালতলা ফাঁড়িতে কর্মরত থাকা অবস্থায় গত ৮ মার্চ হার্ট অ্যাটাক করেন ৪৫ বছর বয়সী কনস্টেবল স্বপন কুমার বর্মণ। জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ মার্চ তিনি ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে।

তার একমাত্র ছেলে সুজয় তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। সুজয়কে নিয়ে স্বপনের স্ত্রী কাকলী রানী বর্মণ থাকেন গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানার ভানমারা গ্রামে। ভানমারা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক কাকলী। তার স্বামীর বাড়ি পাশের ঠাকুরপাড়া গ্রামে।

কাকলী চন্দ্র বর্মণ যুগান্তরকে বলেন, ২০০৭ সাল থেকে আমি স্কুলে চাকরি করি। স্বামীর মৃত্যুর পর ২৫-৩০ লাখ টাকা পেয়েছি। কমিউনিটি ব্যাংকে স্বপন বর্মণের পাঁচ লাখ লোন ছিল।

পেনশনের ১৮ লাখ টাকা থেকে ওই পাঁচ লাখ টাকা কেটে নেয়া হয়েছে। এখন স্বামীর বেতনের অর্ধেক টাকা (নয় হাজার ৭৮৬) পাচ্ছি। ওই টাকা এবং আমার বেতনের টাকা দিয়ে সংসার চলে।

তিনি বলেন, আমার স্বামী ভিটেমাটি ছাড়া আমাদের জন্য কিছু রেখে যেতে পারেননি। স্বামীর ইচ্ছা অনুযায়ী ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ করতে চাই। এ বিষয়ে সরকারের সহযোগিতা চাই।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২২ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন কনস্টেবল আখতার হোসেন। ওই সময় তিনি মতিঝিল ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত ছিলেন। দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে রোজিনা আক্তার পায়েল এইচএসসি পাস করেছেন।

ছোট মেয়ে আইরিন আক্তার অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। আখতারের বাড়ি দিনাজপুর সদরে। তার স্ত্রী আয়েশা আক্তার দুই মেয়েকে নিয়ে সাভারের মজিদপুর এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন। আখতারের স্ত্রী আয়েশা আক্তার যুগান্তরকে বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর এ পর্যন্ত ৪৫ লাখ টাকা পেয়েছি। আমি গৃহবধূ।

পারিবারে কোনো আয়ের উৎস না থাকায় ওই টাকা থেকে পাঁচ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। পরে স্বজনদের পরামর্শে গত মাসে ৪০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনেছি। এটা দিয়েই সংসার চালানোর কথা ভাবছি।

মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার স্বপ্ন ছিল আখতারের। সহযোগিতা পেলে মেয়েদের পড়ালেখার সুব্যবস্থা হতো। আয়েশা বলেন, আমাদের গ্রামের বাড়িতে একটি ঘরও নেই। অসহায় পরিবারটি সরকারের সহযোগিতা চান।

ডিএমপির পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট (পিওএম) শাখায় কর্মরত থাকা অবস্থায় গত ২ মে মারা যান এসআই সুলতানুল আরেফিন হিরা। তিন মেয়ে ও এক ছেলের জনক হিরা। তার স্ত্রী মনোয়ারা বেগম গৃহিণী। বড় মেয়ে সুমাইয়া সুলতানা অনার্স প্রথমবর্ষে পড়েন। মেজো মেয়ে আফরা খাতুন দশম শ্রেণির ছাত্রী। ছোট মেয়ে সানজিদা সুলতানা অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে।

তার একমাত্র ছেলে মুনতাসির আরেফিনের বয়স মাত্র পাঁচ বছর। হিরার স্ত্রী মনোয়ারা বেগম যুগান্তরকে বলেন, আমার পরিবারে কোনো পুরুষ মানুষ নেই। চার সন্তানের পড়ালেখাসহ সংসারের সবকিছু আমাকে দেখভাল করতে হচ্ছে।

কোনোমতে সংসার চলছে। পুলিশ ব্যাংকে (কমিউনিটি ব্যাংক) বড় মেয়েকে চাকরি দেয়ার জন্য পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানিয়েছি। তার চাকরিটা হলে আমাদের একটু সুবিধা হয়।

ডিএমপি পিওএম বিভাগে কর্মরত থাকা অবস্থায় গত ৫ মে মারা যান এএসআই শ্রী রঘুনাথ রায়। স্ত্রী মঞ্জু রানী নাথ গৃহিণী। মেয়ে তৃষ্ণা রানী নাথ এমএসসিতে পড়েন।

ছেলে প্রান্ত দেবনাথ এইচএসসি পাস করেছেন। রঘুনাথের মেয়ে তৃষ্ণা রানী নাথ টেলিফোনে বলেন, বাবার অনুপস্থিতে আমরা এখন খুব কষ্ট করে চলছি। বাবা সব সময় মেসে থেকে চাকরি করেছে। বাড়িতে থাকার মতো আমাদের ভালো একটি ঘরও নেই।

ট্রাফিক উত্তর বিভাগে কর্মরত থাকা অবস্থায় গত ২৯ এপ্রিল প্রাণ হারান কনস্টেবল আশেক মাহমুদ। তার স্ত্রী মমতাজ বেগম সুমী গৃহিণী। দুই ছেলের জনক তিনি। বড় ছেলে ফাহিম মাহমুদ এইচএসসি পাস করেছেন।

ছোট ছেলে নাইমুর মাহমুদ নবম শ্রেণির ছাত্র। আশেক মাহমুদের স্ত্রী মমতাজ বেগম সুমী বলেন, দুই ছেলেকে নিয়ে আমার স্বামীর অনেক বড় স্বপ্ন ছিল। আমি এখন তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি। আমাদের পরিবার খুবই অসচ্ছল। স্বামী মারা যাওয়ার পর সব মিলিয়ে ৩০ লাখ টাকা পেয়েছি। ওই টাকাই এখন আমাদের পুঁজি।-সূত্র: যুগান্তর


ফেইসবুক কমেন্ট অপশন
এই বিভাগের আরো খবর
পুরাতন খবর খুঁজতে নিচে ক্লিক করুন


আমাদের ফেসবুক পেইজ