শুক্রবার, ডিসেম্বর ২, ২০ ২২
তিতাস (কুমিল্লা) প্রতিনিধি::
২৩ নভেম্বর ২০ ২২
৫:৪৬ অপরাহ্ণ

হোমনার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রইফ ভূঁইয়া আর নেই

কুমিল্লার হোমনার জগন্নাথকান্দির বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুর রউফ ভূঁইয়া আর নেই । মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৭০ বছর। মৃত্যুকালে তিনি ২ছেলে ও ৩ মেয়ে স্ত্রীসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁর এক ছেলে মো. মহসিন হবিব এক সময়কার হোমনা ছাত্রলীগের সভাপতি ও বর্তমান পর্তুগাল প্রবাসী ইউরোপিয় ইউনিয়ন আ.লীগের সভাপতি। ২৩ নভেম্বর বুধবার রাত আড়াইটার দিকে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইহকালিন জীবন ত্যাগ করেন।

(ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মরহুমের জানাযার নামাজ বৃহস্পতিবার বাদ যোহর জগন্নাথকান্দি গ্রামে আনুষ্ঠিত হবে। শতাব্দির কৃতি শিক্ষার্থী বই অবলম্বনে বীর মুক্তিযোদ্ধা আঃ রউফ ভূঁইয়ার সংক্ষিপ্ত জীবনের স্মৃতিচারণ।জনাব আঃ রউফ ভূঁইয়া। ১৯৫২ সালের ২২ এপ্রিল (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) কুমিল্লার হোমনার জগন্নাথকান্দি গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। আঃ রউফ ভূঁইয়া'র শৈশব কেটেছে তাঁর নিজ গ্রাম জগন্নাথকান্দিতেই। পরে তিনি ১৯৬৪ সালে চলে যান জেলা সদর কুমিল্লাতে।শিক্ষা জীবন:১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত জগন্নাথকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৬৩-১৯৬৪ সালে মাথাভাঙ্গা ভৈরব উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ক্লাস ষষ্ঠ-সপ্তম, শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে তিনি চলে যান কুমিল্লা শহরে। ১৯৬৭ সালে কুমিল্লা থেকে এসএসসি পাস করেন।

১৯৭০ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে এবং ১৯৭১ সালে বিএসসি ফাস্ট ইয়ারে ভর্তি হবার পর'ই স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। তখন আঃ রউফ ভূঁইয়া লেখাপড়া ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে চলে যান। যুদ্ধ শেষে দেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭২ সালে পুনরায় বিএসসিতে ভর্তি হয়ে লেখাপড়া শুরু করেন। বিএসসি পরীক্ষা দেবার পর বিভিন্ন সমস্যার কারণে আর লেখাপড়া বেশিদূর গড়ায়নি।বৈবাহিক জীবন:দেশ স্বাধীন হবার পর যুদ্ধ থেকে ফিরে আঃ রউফ ভূঁইয়া ১৯৭২ সালে বিএসসি সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র থাকা অবস্থায় বিয়ে করেন। বর্তমানে আঃ রউফ ভূঁইয়া ২ ছেলে ও ৩ মেয়ের জনক।কর্ম জীবন:আঃ রউফ ভূঁইয়া ১৯৭৩ সালে বিএসসি পরীক্ষা দেবার পর লেখাপড়া ছেড়ে চাকুরির পিছু ঘুরতে থাকেন।

কিন্তু কোথাও কোন চাকুরির ব্যবস্থা না হলে শেষে বাধ্য হয়ে ১৯৭৬ সালে মৌলভীবাজারে ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত মৌলভীবাজার, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জসহ আরো বিভিন্ন জেলায় ব্যবসা করেও তেমন সাফল্য না পেয়ে ১৯৮১ সালে ফের কুমিল্লায় ফিরে আসেন। ১৯৮৫ সালে তাদের সংসারে নেমে আসে এক ভয়াবহ দুর্দশা। যার ফলে বাধ্য হয়ে ছেলে মেয়েসহ সপরিবারে গ্রামে ফিরে আসেন এবং ১৯৮৬ সালের জুলাই মাসে জার্মান চলে যান।

জার্মানিতে এক বছর থাকার পর সেখান থেকে চলে যান সুইজারল্যান্ড। সুইজারল্যান্ডে চার বছরসহ মোট পাঁচ বছর প্রবাসে কাটিয়ে ১৯৯১ সালে ফের দেশে ফিরে এসে পুনরায় ব্যবসা শুরু করেন। যুদ্ধকালীন ঘটনাঃ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আঃ রউফ ভূঁইয়া অদম্য সাহস নিয়ে বীরের বেশে ঝাপিয়ে পড়েন পাকিস্তানি শত্রু বাহিনীর ওপর। ২৬ মার্চের কালো রাতের পর যখন সারাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েন। তখন আঃ রউফ ভূঁইয়া বিএসসি'র ছাত্র ছিলেন এবং ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি চলে যান মহান মুক্তিযুদ্ধে। আঃ রউফ ভূঁইয়া ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের শেষের দিকে তৎকালীন কুমিল্লা জেলার আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা, পালাটানা ক্যাম্পে চলে যান।

পালাটানা ক্যাম্পে দুই থেকে তিন মাস ট্রেনিং দেয়ার পর। উচ্চ ও হাই ট্রেনিং এর জন্য চলে যান, রাজপুত রেজিমেন্টে। এই রাজপুত রেজিমেন্ট থেকেই উচ্চ ও হাই ট্রেনিং নিয়ে, যুদ্ধের সব রকম কৌশল ও সরঞ্জাম নিয়ে ৩০ নভেম্বর আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে রাত ১০টায় বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। ১লা ডিসেম্বর ১৯৯৭১ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা মুক্তিবাহিনীর ওপর এয়ার এটাক করতে থাকে। তৎক্ষনাৎ ভারতীয় মিত্র বাহিনী সহ সকল মুক্তিবাহিনী গঙ্গা সাগরের পূর্ব দিকে; আখাউড়া রেল লাইন থেকে ১০০ গজ দূরে গর্ত করে যে যার মতো করে আত্মগোপন করে ছিলো।উল্লেখ্য যে, ১ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এতটাই নিকটে অথবা কাছে চলে এসেছিল; যে তখন যদি মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানীদের আঘাত প্রতিহত করে অথবা পাল্টা আক্রমণ করে তাহলে হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ্য করে আরো বেশি আক্রমণ করতে থাকবে।

অথবা পরিস্থিতি আরো ভয়ানক রূপ ধারণ করবে। কেননা তখনো মুক্তি বাহিনীর হাতে তেমন উন্নত অস্ত্র ছিল না। তাছাড়া তারা সংখ্যায় খুব কম ছিল। তাই তারা আত্মগোপন করে ছিল।এভাবেই ১ ডিসেম্বর চলে গেল। ২ডিসেম্বর ভারতীয় মিত্রবাহিনী যখন পিছন দিক থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সাপোর্ট করতে শুরু করল তখন মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানিদের ওপর ঝাপিয়ে পড়ল। পাকিস্তানীরাও পাল্টা আক্রমণ করতে শুরু করল। এভাবে ২ থেকে ৫ ডিসেম্বর একটানা যুদ্ধ চলতে থাকে। ৫ ডিসেম্বর যখন বিকেল হতে চলল তখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পরাজিত হয়ে পিছু ফিরতে লাগল। মুক্তিযোদ্ধারা সন্ধ্যা ৬ টায় আখাউড়া দখল করলে ৬ ডিসেম্বর আখাউড়া হানাদার মুক্ত ও স্বাধীন হয়।এভাবেই ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের অসংখ্য যুদ্ধের সাথে জড়িয়ে ছিলেন আঃ রউফ ভূঁইয়া। তেমনি আরেকটি ভয়াভহ যুদ্ধ হয়েছিল ৯ ডিসেম্বর আশুগঞ্জে।

ঐ দিন সিনেমা হল ও রেল লাইনের পাশের খালটা পার হবার পথে'ই পাকিস্তানি শত্রু বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ্য করে গুলি করতে থাকে এবং মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা আক্রমণ করতে থাকলে শুরু হয়ে যায় এক তুমুল যুদ্ধ। এই যুদ্ধ এক নাগারে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত চলে। এই ভয়াবহ যুদ্ধে ভারতীয় অর্ধশতাধিক মিত্রবাহিনী নিহত হয় এবং ভারতীয় কমান্ডিংয়ে যারা ছিল তাদের মধ্য থেকে ৮-১০ জন অফিসারও প্রাণ হারায়। এই যুদ্ধে আঃ রউফ ভূঁইয়ার সহকারী অনেক মুক্তিযোদ্ধাও শহীদ হয়। পাকিস্তানি শত্রুবাহিনী যখন একের পর এক আর্টিলারীর আঘাত করতেই থাকে। তখন ওপর থেকে নির্দেশ করা হয়, 'যে যেভাবে পারো নিজেদের প্রাণ বাঁচাও।'' তখন আঃ রউফ ভূঁইয়া সহ সকল মুক্তিযোদ্ধারা একটু পিছু ফিরে যেতে লাগল।

এর'ই মাঝে দীপক ও আঃ রউফ নামের ২ জন মুক্তিযোদ্ধার পায়ে গুলি লাগে তখন আঃ রউফ ভূঁইয়া তাদের কাঁধে তুলে মেঘনা নদী পার হবার পর দেখতে পান ভারতীয় মিত্রবাহিনী আর্টিলারী গান, ট্যাঙ্ক ও কামান নিয়ে এগিয়ে আসছে। তখন মিত্রবাহিনীর সহযোগিতায় ১০ ডিসেম্বর পুনরায় আশুগঞ্জের পূর্বের জায়গায় ফিরে আসে এবং মিত্রবাহিনীর একের পর এক আর্টিলারী, গান ও ট্যাঙ্কের আঘাতে পাকিস্তানি শত্রুবাহিনী পরাজিত হয়ে পিছু ফিরে যেতে লাগে। ১০ ডিসেম্বর রাতে আশুগঞ্জ সম্পূর্ণ হানাদার মুক্ত হলে ১১ ডিসেম্বর আশুগঞ্জ স্বাধীন ও হানাদার মুক্ত বলে ঘোষণা করা হয়।

এভাবেই আঃ রউফ ভূঁইয়াদের মতো বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অদম্য সাহস, অসীম শক্তি, ত্যাগ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ফলেই দীর্ঘ নয় মাসের বর্বর হত্যাকাণ্ড ও রণাঙ্গণের পর পাকিস্তানি হানাদারদের বর্বরতা থেকে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন দেশ। একটি লাল সবুজের পতাকা। একটি সোনার বাংলাদেশ।পুনশ্চ: মাথাভাঙ্গা ভৈরব উচ্চ বিদ্যালয়ের শত বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত শতাব্দির কৃতি শিক্ষার্থী বই থেকে তথ্য সংগৃহীত।বইটি লিখেছেন শিপন আহমেদ হিমেল।

ফেইসবুক কমেন্ট অপশন
এই বিভাগের আরো খবর
পুরাতন খবর খুঁজতে নিচে ক্লিক করুন


আমাদের ফেসবুক পেইজ