৭:৩৬ অপরাহ্ণ
কুশিয়ারার দুই তীরে বাংলাদেশ-ভারতের সম্প্রীতির মিলনমেলা, জকিগঞ্জে দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জন
কুশিয়ারা নদীর দুই তীরে দুই দেশ, অথচ উৎসবের আনন্দে যেন নেই কোনো সীমান্ত। বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের মিলন, ধর্মীয় সম্প্রীতি আর সৌহার্দ্যের আবহে সিলেটের জকিগঞ্জে সম্পন্ন হয়েছে শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রতিমা বিসর্জন। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বিজয়া দশমীতে জকিগঞ্জ পৌর এলাকার কাস্টমঘাটে কুশিয়ারা নদীতে প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে দুই দেশের নদীতীরে জড়ো হন হাজারো মানুষ।
ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর ভক্তদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে সীমান্তবর্তী জনপদ। বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে শোভাযাত্রা নিয়ে কাস্টমঘাটে আসেন পূজার্থীরা। শেষবারের মতো তেল-সিঁদুর, ধান-দূর্বা ও মিষ্টি দিয়ে দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান তাঁরা। মণ্ডপে মণ্ডপে চলে সিঁদুর খেলা, মন্ত্রপাঠ ও নানা আনুষ্ঠানিকতা।
দেবীকে বিদায় জানানোর মুহূর্তে ভক্তদের মধ্যে আনন্দের পাশাপাশি বিষাদের ছায়াও দেখা যায়। প্রতিমা বিসর্জন ঘিরে বাংলাদেশের জকিগঞ্জের কাস্টমঘাট এবং ভারতের করিমগঞ্জের কাস্টমঘাট-সংলগ্ন অখণ্ড মণ্ডলী মন্দির এলাকায় সৃষ্টি হয় এক অনন্য মিলনমেলার। কুশিয়ারা নদীর এপার-ওপারে দাঁড়িয়ে দুই দেশের মানুষ একসঙ্গে উপভোগ করেন বিসর্জনের আয়োজন। ঢাকঢোল, কাঁসর, করতাল, মন্দিরা, বাঁশি ও শঙ্খের ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে নদীর দুই তীর। স্থানীয়দের মতে, কয়েক যুগ ধরে কুশিয়ারা নদীর দুই তীরে প্রতিমা বিসর্জনকে ঘিরে বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের এ ঐতিহ্য চলে আসছে।
ভৌগোলিক সীমারেখা দুই দেশকে আলাদা করলেও উৎসবের আনন্দ, মানবিক বন্ধন ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা এ জনপদের মানুষকে কাছে টেনে আনে। ফলে প্রতিমা বিসর্জন কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে না, হয়ে ওঠে দুই দেশের মানুষের মিলন ও সম্প্রীতির উপলক্ষ। বিজয়া দশমীতে পূজার্থীদের শুভেচ্ছা জানাতে বিসর্জন ঘাটে উপস্থিত ছিলেন রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, পুলিশ, সাংবাদিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রতিমা বিসর্জন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা এবং অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, ডিবি পুলিশ, বিজিবি, আনসার সদস্য ও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল সতর্ক অবস্থানে ছিল।
ভারতের করিমগঞ্জেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা দেখা যায়। প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপজেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের আহ্বায়ক সঞ্জিত চক্রবর্তী পান্না ও উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি হীরালাল বিশ্বাস সভাপতিত্ব করেন। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা বিনয় ভূষণ দাস ও পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সেক্রেটারি সুরঞ্জিত কুমার রায় যৌথভাবে অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জকিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুজিত কুমার চন্দ। বিশেষ অতিথি ছিলেন জকিগঞ্জ চৌকি আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইব্রাহিম তরফদার ও জকিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রাজ্জাক। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য দেন জকিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সহসভাপতি ইকবাল আহমদ তাপাদার, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও জকিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি শফিকুর রহমান, জকিগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাসান আহমদ, পৌর বিএনপির সভাপতি মাসুক আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক শিব্বির আহমদ রনি।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন সিলেট জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সদস্য সত্যজিৎ দত্ত পুরকায়স্থ, জকিগঞ্জ উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সহসভাপতি নিহার রায় এবং উপজেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের যুগ্ম আহ্বায়ক তাপস বিশ্বাস। বক্তব্যে বিএনপি নেতারা তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, ‘তারেক রহমানের সরকার বারবার দরকার।’ তাঁরা জানান, প্রতিটি পূজামণ্ডপে চালের বরাদ্দ আগের তুলনায় ১০০ কেজি বাড়িয়ে ৬০০ কেজি করা হয়েছে। পূজার সময় শতভাগ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের অনুদান ৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা করার বিষয়টিও তাঁরা উল্লেখ করেন।
এসব উদ্যোগকে নতুন ইতিহাস হিসেবে অভিহিত করেন বক্তারা। বক্তারা আরও বলেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় ২০২৬ সালে দুর্গাপূজার আয়োজন কোনো ঝামেলা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে। তাঁরা জকিগঞ্জের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রশংসা করে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন হওয়ায় প্রশাসনসহ সর্বস্তরের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। উল্লেখ্য, এ বছর সিলেট জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ ৯৫টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব উদ্যাপিত হয়েছে জকিগঞ্জ উপজেলায়। কুশিয়ারা নদীর দুই তীরে বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের অংশগ্রহণে প্রতিমা বিসর্জনের এ আয়োজন আবারও তুলে ধরেছে সীমান্তের দুই পাশের মানুষের দীর্ঘদিনের সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের চিত্র। ___