রবিবার, মে ২৬, ২০ ২৪
এস ডি সুব্রত::
২০ এপ্রিল ২০ ২৩
১০ :০ ২ অপরাহ্ণ

ঈদযাত্রায় নেই যানজট: জনমনে স্বস্তি

এ বছর ঈদযাত্রা বেশ স্বস্তির একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। অন্যান্য বছরের মতো যানজটের অসহনীয় দৃশ্য নেই বললেই চলে। বিআরটিএ চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘গত দুই-তিন দিন আমাদের কাছে যে তথ্য আছে, তাতে কোথাও কোন যানজট সৃষ্টি হয়নি। কোনো ধরনের অভিযোগ আমাদের কাছে নেই। এমনকি অতিরিক্ত ভাড়া আদায়েরও তেমন কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে নেই।’ঈদযাত্রায় কোথাও কোনো যানজট সৃষ্ট হয়নি দাবি করে তিনি বলেছেন, বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগও পায়নি সংস্থাটি।

গত দুই-তিন দিনের তথ্যের ভিত্তিতে বিআরটিএ চেয়ারম্যান বলেন, ‘বিআরটিএ সদর কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। আমরা কন্ট্রোল রুম থেকে ১৩০টা ক্যামেরার মাধ্যমে যেসব জায়গায় যানজট হয়, সেসব জায়গায় আমরা মনিটরিং করছি। কোথাও যানজট হলে আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি। তিনি বলেন, ‘মন্ত্রী মহোদয়ের নেতৃত্বে আমাদের একটা সভা হয়েছে, যেখানে সকল জেলার প্রশাসক, সকল বিভাগীয় কমিশনার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সচিববৃন্দ এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতম কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ঈদযাত্রা যেন এবার নির্বিঘ্নে হয়, এ জন্য ঢাকার ২০টি পয়েন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ ৪৬টি পয়েন্ট নির্ধারণ করে আমাদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত করেছি। যেগুলো বেশি বেশি যানজটপূর্ণ পয়েন্ট, সেখানে দুই শিফটে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ আছে। আমাদের মনিটরিং টিমও কাজ করছে।’

তিনি বলেন ,লম্বা ছুটির কারণে যাত্রীদের বাড়ি ফেরায় তাড়াহুড়া কম। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা ঈদের আগে ও পরে সাত দিন রাস্তায় থাকবেন, যাতে কোনো ধরনের কোনো সমস্যা না হয়।’আনফিট গাড়ি রাস্তায় নামার বিষয়ে বলেন, ‘ঈদযাত্রায় অনেক সময় কিছু আনফিট গাড়ি রংপুরে রাস্তায় নামানোর প্রবণতা আছে। এ জন্য আমরা মালিকদের নিয়ে মিটিং করেছি। আইজিপি মহোদয়কে নিয়েও মিটিং হয়েছে, যাতে কোনো আনফিট গাড়ি রাস্তায় না আসতে পারে। গার্মেন্টসের আনফিট গাড়িও যেন দূর পাল্লায় না যায়, সে জন্য তাদের সঙ্গে আমরা সভা করেছি। একটা প্রাণও যেন না যায়, সে জন্য আমরা সব ধরনের সতর্কতা নিয়েছি।’ এ বছর দূরপাল্লার রুটে দীর্ঘসময়ে আটকে থাকার মতো যানজটের খবর পাওয়া যায়নি। বাস, লঞ্চ ও ট্রেনে ঘরমুখো মানুষের ভিড় ছিল। তবে তা ছিল পরিবহণগুলোর সক্ষমতার মধ্যেই। বেশির ভাগ ট্রেন নির্দিষ্ট সময়ে ছেড়ে গেছে।

টিকিট ছাড়া কাউকে কমলাপুর প্ল্যাটফরমে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ঢাকা নদীবন্দরে যাত্রী ডেকে ডেকে তুলতে দেখা গেছে লঞ্চ শ্রমিকদের। অন্যান্য দিনের তুলনায় বুধবার লঞ্চের সংখ্যাও ছিল বেশি। গাবতলী বাস টার্মিনাল দিনভর ফাঁকা থাকলেও সন্ধ্যায় কিছুটা চাপ দেখা গেছে। তবে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে সকাল থেকেই ভিড় ছিল। পদ্মা সেতুর কারণে দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীরা গাবতলীর চেয়ে সায়েদাবাদকে বেছে নিচ্ছেন। ফলে বুধবার ঢাকা থেকে বিভিন্ন পথে যাওয়া মানুষের ঈদযাত্রা ছিল অনেকটাই স্বস্তির। বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল প্লাজায় মোটরসাইকেলের উপচে পড়া ভিড় ছিল। একইভাবে মাওয়ার শিমুলিয়ায় ফেরিঘাটে মোটরসাইকেলের ভিড় দেখা গেছে। আজ ভোর থেকে পদ্মা সেতুতে মোটরসাইকেল চলাচল শুরু হবে। এছাড়া ঢাকা থেকে গাজীপুরে যাওয়ার উত্তরা অংশের বিআরটির উড়ালসড়ক বুধবার খুলে দেওয়া হয়।

সড়ক, ট্রেন ও লঞ্চ টার্মিনালসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোয় পুলিশের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। পুলিশের আইজি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন বুধবার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ও সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল এলাকা পরিদর্শন করেন। সায়েদাবাদ টার্মিনাল পরিদর্শনের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ঈদে সড়ক, নৌ ও রেলপথে ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যে যাত্রীদের নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ, জেলা পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, নৌপুলিশ, রেলওয়ে পুলিশ, র‌্যাবসহ বাংলাদেশ পুলিশের সব ইউনিট একযোগে দায়িত্ব পালন করছে।

ঢাকা শহরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে কন্ট্রোল রুম, সাব-কন্ট্রোল রুম স্থাপন করে নিরাপত্তাব্যবস্থা মনিটরিং করা হচ্ছে যাতে যাত্রীসাধারণ নিরাপদে নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন। বুধবার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে বেশির ভাগ ট্রেন নির্দিষ্ট সময়ে ছেড়ে গেছে। যাত্রীদের টিকিট দেখে কমলাপুর স্টেশনে ঢুকতে দেওয়া হয়েছে। এতে যাত্রীরা সহজেই তাদের আসনে গিয়ে বসতে পেরেছেন। ঢাকা রেলওয়ে বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা শাহ আলম কিরণ শিশির যুগান্তরকে বলেন, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন দিয়ে কোনো বিনা টিকিটের যাত্রীকে প্ল্যাটফরমে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। বিনা টিকিটের যাত্রী রোধে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। যারা অনলাইনে টিকিট কাটতে পারেনি, তাদের একটি বিরাট অংশ স্টেশনে আসছেন স্ট্যান্ডিং টিকিট কাটতে। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার মাসুদ সারোয়ার যুগান্তরকে জানান, এবার ঈদযাত্রায় ৯৮ শতাংশ ট্রেন শিডিউল অনুযায়ী চলাচল করছে।

নামমাত্র ট্রেন ১০ থেকে ৪০ মিনিট বিলম্বে চলাচল করছে। এমন বিলম্বও হতো না, অতিরিক্ত যাত্রীচাপে বিভিন্ন স্টেশনে নির্ধারিত বিরতির সময়ের চেয়ে ২/১ মিনিট বেশি হচ্ছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা ও সেবা নিশ্চিতে তা করতে হচ্ছে। বুধবার ঢাকা নদীবন্দরে সরেজমিনে দেখা যায়, টার্মিনালে উপচে পড়া ভিড় নেই। যাত্রীদের ডেকে ডেকে তুলছেন শ্রমিকরা। ঢাকা নদীবন্দরের যুগ্মপরিচালক (নৌনিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগ) মো. কবির হোসেন যুগান্তরকে বলেন, যাত্রীচাপ সহনীয় পর্যায়ে আছে। অন্যদিকে সিরাজগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম সংযোগ মহাসড়কে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে উত্তরবঙ্গমুখী লেনে যানবাহনের চাপ থাকলেও নেই কোন যানযট। শেষ মুহুর্তে নাড়ির টানে প্রিয়জনদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে যাত্রিবাহি বাস, ট্রাক, পিকআপভ্যান, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরছেন উত্তরাঞ্চলের মানুষ।

সিরাজগঞ্জের ট্রাফিক পরিদর্শক (প্রশাসন) সালেকুজ্জামান খান সালেক জানান, সিরাজগঞ্জের ৪৫ কিলোমিটার মহাসড়কে যানবাহনের চাপ থাকলেও কোনও যানজট বা ধীরগতি নেই, যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। এই মহাসড়কে দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার যানবাহন চলাচল করে এবং ঈদের সময় এর মাত্রা বেড়ে যায় কয়েকগুন। এছাড়া যানবাহন যেন এলোমেলোভাবে ঢুকে যানজট সৃষ্টি করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখা হচ্ছে।

গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর অংশের পরিস্থিতি অনেকটাই ভালো রয়েছে। যদিও সকাল থেকেই মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তা সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নানা শ্রেণী-পেশার ঘরমুখো মানুষের ভিড় রয়েছে এবং যানবাহনেরও চাপ রয়েছে অনেক বেশি। মহাসড়কে যানবাহনের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে চান্দনা চৌরাস্তা, ভোগড়া বাইপাস মোড়, বোর্ড বাজার, স্টেশন রোডসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত সংখ্যক ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েনসহ নানা পরিকল্পনা করে সার্বক্ষণিক সড়ক মনিটরিং করা হচ্ছে। অতিরিক্ত সংখ্যক যাত্রীর তুলনায় কোন কোন রুটের যানবাহন কম রয়েছে। তাই নির্ধারিত গন্তব্যে যেতে অনেকেরই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

আর এই সুযোগে বেশি ভাড়া নেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে ‌ । গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন জানিয়েছেন, এবারের ঈদ যাত্রায় এই মহাসড়কের যানবাহন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখাতে তিন শিফটে এক হাজার ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি এপিপিএন সদস্য ও রোভার স্কাউট মোতায়েন রয়েছে। আনফিট গাড়ি যাতে না চলাচল করতে পারে সেজন্য বিশেষভাবে খেয়াল রাখা হচ্ছে। এছাড়াও মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে কয়েকটি রেখার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। কোন গাড়ি অচল হয়ে গেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে সরানোর ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় ঈদযাত্রা পুরোটাই বলা যায় স্বস্তিদায়ক ।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ।

০১৭৭২২৪৮২২৪ sdsubrata2022@gmail.com

ফেইসবুক কমেন্ট অপশন
এই বিভাগের আরো খবর
পুরাতন খবর খুঁজতে নিচে ক্লিক করুন


আমাদের ফেসবুক পেইজ