সোমবার, জুন ২৪, ২০ ২৪
এস ডি সুব্রত::
১৫ এপ্রিল ২০ ২৩
২:২৫ অপরাহ্ণ

যাকাতের আর্থ-সামাজিক গুরুত্ব

দেহের সঙ্গে সম্পর্কিত ইবাদতের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল নামাজ, আর সম্পদের সঙ্গে সম্পর্কিত ইবাদতের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল যাকাত। ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের মধ্যে যাকাত তৃতীয়।

এটি একটি অর্থনৈতিক ইবাদত এবং ইসলামী অর্থ ব্যবস্থার মূলভিত্তি। যাকাত প্রদানে উপযুক্ত সম্পদের মালিক হয়েও যাকাত আদায় না করলে, সে ফাসিক হিসেবে গণ্য হবে। যাকাত অস্বীকারকারী কাফির।

এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, আর তোমরা সালাত তথা নামাজ প্রতিষ্ঠা করো এবং জাকাত প্রদান করো। (সূরা আল মুজাম্মেল, আয়াত নং- ২০) আমাদের সমাজের মাঝে যাদের উপর যাকাত ফরজ সে যদি তারা যদি দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করে তাহলেই যাকাত দাতা ও যাকাত গ্রহিতা উভয়েই সম্মানিত হবে ।

যাকাত শব্দটা প্রশংসা করা, প্রাচুর্য লাভ করা, সংশোধন করা অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে । তবে প্রসিদ্ধ অর্থ হলো পবিত্র করন বা বৃদ্ধি করন। ধনী দরিদ্রের বৈষম্য দূর করে ও ভ্রাতৃত্ববোধের উন্মেষ তৈরি করে যাকাত। যাকাত ধনী দরিদ্রের মাঝে বৈষম্য দূর করে ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ সৃষ্টি করে। যাকাত দরিদ্রের প্রতি ধনীর করুণা নয়, বরং ধনীর সম্পদে দরিদ্রের অধিকার।

মুসলিম জনগোষ্ঠী এক সুমহান ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে জড়িয়া থাকে যাকাতের কারণেই । এজন্য আল্লাহর তায়ালা বলেন, এরপর তারা যদি তওবা করে, সালাত কায়িম করে এবং যাকাত দেয় তাহলে দীনের সূত্রে তারা তোমাদের ভাই হবে। বিস্তারিতভাবে বলা যায়, নিসাব পরিমাণ সম্পদ অর্থাৎ ৭.৫ তোলা সোনা বা ৫২.৫ তোলা রূপা কিংবা এর যেকোনো একটির সমপরিমাণ অর্থ যদি কোনো মুসলিম ব্যক্তির মালিকানায় পূর্ণ এক বছর থাকে এবং যদি তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত হয়, তাহলে শরীয়তের নির্ধারণ অনুযায়ী সে সম্পদ থেকে ২.৫ শতাংশ হারে অর্থ নির্দিষ্ট আটটি খাতের যেকোনো খাতে দান করতে হয়। বস্তুত শরিয়তের নির্দেশানুযায়ী সম্পদ দানের এ পদ্ধতিকেই যাকাত বলে।

সামাজিক নিরাপত্তা তথা আর্থ-সামাজিক উন্নতি বিধানের ক্ষেত্রে যাকাতের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ইসলামে জাকাতের বহু ফজিলত রয়েছে। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ ফরমান, যারা আল্লাহর রাস্তায় স্বীয় ধন-সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়, প্রত্যেকটি শীষে একশ’ করে দানা থাকে।

আল্লাহ অতি দানশীল, সর্বজ্ঞ। (সূরা বাকারা, আয়াত নং-২৬১) । সমাজের যে সকল লোক অর্থ উপার্জনে অক্ষম এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় বাস করে, যাকাত ব্যবস্থা তা দূরীকরণে অনন্য ভূমিকা রাখে। সমাজের ধনী শ্রেণী যদি সঠিকভাবে যাকাত প্রদান করে তাহলে সমাজে কোনো দরিদ্র মানুষ থাকবে না। অর্থের অভাবে মানুষ সামাজিক অনাচার তথা চুরি, ডাকাতি, খুন, রাহাজানি, ছিনতাই ও সন্ত্রাস ইত্যাদি অপরাধে লিপ্ত হয়ে পড়ে।

যাকাত ব্যবস্থা এসব সামাজিক অনাচার নির্মূলে অনন্য ভূমিকা পালন করে। যাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে ধনীদের অন্তরে দরিদ্রদের প্রতি চরম সহানুভূতি সৃষ্টি হয়। ধনীরা দরিদ্রের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এগিয়ে আসে। যাকাতের অর্থ সংগ্রহ করে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে সমাজের অসংখ্য জনহিতকর কার্যাবলি সম্পাদন করা যায়।

ভিক্ষাবৃত্তি একটি সামাজিক ব্যাধি। যাকাতের অর্থ দিয়ে দরিদ্র কল্যাণ ও দরিদ্রের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে ভিক্ষা বৃত্তি দূরীকরন করা যায়। সমৃদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যাকাতের সামাজিক গুরুত্ব অনেক। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, জনৈক বেদুঈন ব্যক্তি নবী করিম (সা.) এর খিদমতে এসে বললেন, আমাকে একটি আমল বাতলিয়ে দিন যা করলে আমি জান্নাতে দাখিল হতে পারবো।

নবী করিম (সা.) বললেন, তুমি আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুর শরিক করবে না। ফরজ সালাত আদায় করবে, ফরজ জাকাত প্রদান করবে এবং রমজানের সাওম পালন করবে। যাকাত অভাব হীন জীবন গড়ে দিয়ে সমৃদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব করে তোলে। গুরুত্ব অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে যাকাতের গুরুত্ব অপরিসীম।

যাকাত ইসলামি অর্থনীতির মূল ভিত্তি। ইসলামি রাষ্ট্রের সিংহভাগ অর্থই যাকাত থেকে সংগৃহীত হয়ে থাকে। যাকাত ইসলামি রাষ্ট্রের জাতীয় আয়কে বৃদ্ধি করে। রাষ্ট্রের অন্যান্য আয়ের সাথে যাকাতের অর্থ একত্রিত হয়ে জাতীয় আয় বহুলাংশে বেড়ে যায় এবং অর্থনৈতিক ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে ।রাষ্ট্রে ধনী-দরিদ্রের মাঝে যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে তা যাকাত ব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিরসন করা সম্ভব ।

যাকাত আরবি শব্দ। এর দুটি প্রসিদ্ধ অর্থ হলো- পবিত্রকরণ এবং বৃদ্ধিকরণ। জাকাতের পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লামা বদরুদ্দনি আইনী (রা.) বলেন, নিসাব পরিমাণ সম্পদ ব্যক্তি মালিকানায় এক বছর অতিবাহিত হওয়ার পর তার থেকে একটি নির্দিষ্ট অংশ হাশেমী বংশ ছাড়া অন্যান্য দরিদ্রকে প্রদান করার নাম জাকাত। যাকাত অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণের মহৌষধ। কেননা যাকাত ব্যবস্থার কারণে বিত্তশালীদের অর্থ এক স্থানে সঞ্চিত থাকতে পারে না। সম্পদ সমাজের দরিদ্রদের মাঝে আবর্তিত হতে থাকে। তাই দারিদ্র্য বিমোচনে যাকাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সঠিকভাবে যাকাতের অর্থ দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করলে সমাজ থেকে দারিদ্র্য দূর হতে বাধ্য। যাকাতের অর্থ দ্বারা ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রকে ঋণমুক্ত করা যায়।

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় যাকাত উত্তোলন ও বিতরণের ব্যবস্থা করলে যাকাত বিভাগে অসংখ্য লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। যাকাত ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে পুঁজিবাদের অভিশাপ থেকে জাতি মুক্তি পাবে। যাকাত ব্যবস্থা সমাজ থেকে বেকারত্ব দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যাকাতের অর্থ দিয়ে বেকার লোকদের কোনো না কোনো কাজের ব্যবস্থা করা সম্ভব । যাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের মাঝে প্রচলিত অর্থনৈতিক প্রতারণা বন্ধ করা যায়। আধুনিক কর ব্যবস্থায় ফাঁকির প্রবণতা থাকলেও যাকাত ব্যবস্থায় ফাঁকি অকল্পনীয়। কেননা বিত্তশালীরা একান্তই ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে আল্লাহর নির্দেশ পালনের লক্ষ্যে স্বেচ্ছায় যাকাত দিয়ে থাকে। জনকল্যাণমূলক কাজ যাকাতের অর্থে এতিমখানা, বিদ্যালয় ও দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি জনকল্যাণমূলক কার্য- করা যায়। জাতীয় আয়, ইসলামি অর্থ ব্যবস্হায় রাষ্টীয় রাষ্ট্রীয় আয়ের প্রধান উৎস যাকাত। যার ওপর যাকাত ফরয হবে সে ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট হারে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যাকাতের অর্থ জমা দেবে। এভাবে জাতীয় আয় বৃদ্ধি পাবে। পরে পরিকল্পিত ভাবে ব্যায়ের মাধ্যমে এ অর্থ অধিকতর লাভজনক অর্থে পরিনত করা সম্ভব হবে। এতে সমাজ ও রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি সাধন সম্ভব । ধন-সম্পদের যাকাত দিতে কষ্ট বোধ করা বোকামী ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ ধন-সম্পদের আসল মালিক হলেন আল্লাহ তা’আলা। মানুষ শুধু এটা নাড়াচাড়া করার মালিক।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ। ০১৭৭২২৪৮২২৪ । sdsubrata2022@gmail.com

ফেইসবুক কমেন্ট অপশন
এই বিভাগের আরো খবর
পুরাতন খবর খুঁজতে নিচে ক্লিক করুন


আমাদের ফেসবুক পেইজ