বুধবার, এপ্রিল ২১, ২০ ২১
এ টি এম তুরাব::
২১ ডিসেম্বর ২০ ২০
৩:১৭ অপরাহ্ণ

সিলেটে সক্রিয় নারী চোর চক্র
পপি, স্বপ্না, সুমি, লিপি, মালা, শান্তা, মমতা, নাজমা, কমলা, রুজিনা, নাতাশা, শাইনি। এঁরা সকলেই নগরীর চিহিৃত নারী। তাদের পেশা চুরি। বাড়ি সিলেটে না হলেও বসবাস নগর ও শহরতলীতে। বোরকা লাগিয়ে নগরজুড়ে ঘুরে বেড়ায় তারা। সরকারী-বেসরকারী হাসপাতালসহ বিভিন্ন মার্কেটে মার্কেটে দেয় ঢুঁ। আর সুযোগ পেলেই ছিনিয়ে নেয় মোবাইল কিংবা ভ্যানিটি ব্যাগ। ইতোমধ্যে বেশ কয়েক বার জনতা আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। পুলিশ প্রসিকিউশনের মাধ্যমে আদালতে প্রেরণ করলেও বেশিদিন কারাবাস করতে হয়নি। জামিনে বেরিয়ে এসে আবার চুরির ধান্ধা।

এক ডজনের এই চক্রের আরো সদস্যরাও আছেন। প্রতিনিয়ত তাদের খপ্পরে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। সম্প্রতি জালালাবাদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে নারী প্রতারক চক্রের প্রতারণার বিভিন্ন কৌশল। কোথায় কিভাবে তারা চুরি-ছিনতাই করে এমন গোপন কিছু তথ্য।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নারী প্রতারক চক্রটি চুরি করতে গিয়ে কয়েকটি কৌশল অবলম্বন করে থাকে। তারা নগরের বিভিন্ন হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী সেজে যায়। সেখানে ‘টার্গেট’ ঠিক করে সেই টার্গেটের সাথে একই লাইনে দাঁড়ায়। তারপর সুকৌশলে টার্গেট ব্যক্তিকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে ব্যাগ থেকে মোবাইল, টাকা ও মূল্যবান জিনিস নিয়ে দ্রুত সহযোগীর কাছে পাচার করে দেয়।

নগরীর পকেট চোর সিন্ডিকেটের এমনই দুইজন সীমা বেগম পপি ও শামীমা বেগম স¦প্না। দু’জনই বিবাহিত ও বয়স ৩০ বছরের কোটায়। হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার বামুরা গ্রামে বাড়ি হলেও দীর্ঘদিন থেকে তারা বসবাস করে নগরীতে। বর্তমানে উপশহর এইচ ব্লক বিলের পারে থাকে। তারা দু’জনই নারী পকেট চোর। নগরের জিন্দাবাজার, বন্দরবাজার, রিকাবীবাজার, আম্বরখানাসহ অধিকাংশ এলাকার ব্যবসায়ীদের কাছে তারা পরিচিত মুখ। ঈদ এলেই তাদের দুই জনের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ নারী ছিনতাইদল নামে মার্কেটে। চুরি করতে গিয়ে তারা নগরীর জিন্দাবাজার এলাকায় ধরা পড়ে। ওই সময় আরো কয়েকজন মহিলাও ধরা পড়ে। সীমা-স্বপ্ন’র বিরুদ্ধে সিলেটের বিভিন্ন থানায় প্রায় শতাধিক মামলা রয়েছে।

পুলিশ জানায়, পপি-স্বপ্না পুলিশের হাতে একাধিকবার গ্রেফতার হয়। প্রথম তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করলেও পরে অবশ্য জেরার মুখে চুরির কথা স্বীকার করে। তারা শুধু চোর কিংবা ছিনতাইকারী নয়। তারা অসামাজিক কাজ, মাদক বিকিকিনি সহ নানা ঘটনার সঙ্গে জড়িত। নগরীর দক্ষিণ সুরমায় রয়েছে মহিলা চোর দলের আরেকটি সিন্ডিকেট। ওই সিন্ডিকেটের সঙ্গে রয়েছে তাদের সম্পৃক্ততা।

সুত্র জানায়, গত ৩রা ডিসেম্বর নগরীর রাগিব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীর স্বজন সেজে গিয়েছিলো সীমা ও শামীমা। সেখানে এক রোগীর স্বজনের মোবাইল চুরি করতে গিয়ে তারা জনতার হাতে আটক হয়। পরে তাদের গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও পরবর্তীতে বেরিয়ে এসেই নতুন করে চুরির ধান্ধায় মেতে উঠেছে।

মাজার : নগরীর শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.) মাজারে চোর চক্রের সদস্যদের উপস্থিতি লক্ষণীয়। তারা শাহজালাল ও শাহপরান ভক্তদের সাথে মাজারে উপস্থিত হয়। মাজারে আগত মহিলারা অজু করার সময় পূর্ব থেকে টার্গেটকৃত মহিলার ঠিক পাশে অজু করতে বসে নারী চোর চক্রের সদস্যরা। এসময় কৌশলে ওই মহিলার হাতব্যাগ থেকে মোবাইল, টাকা ছিনিয়ে নেয় এ চক্রের সদস্যরা। এছাড়া তাদের টার্গেটকৃত মহিলা নামাজে সেজদারত অবস্থায় ব্যাগ থেকে টাকা বা মোবাইল হাতিয়ে নেয় এরা।

ব্যবসা প্রতিষ্ঠান : নগরীর বিভিন্ন কাপড় বা কসমেটিকসের দোকানে চক্রের সদস্যরা ৩-৪ জন একসাথে প্রবেশ করে। তাদের সাথে থাকে ৮-১০ বছরের এক বা একাধিক বাচ্চা। দোকানে ঢুকেই তারা কর্মচারী বা ব্যবসায়ীদের ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করে। একেকজন একেক পণ্য দেখাতে বলেন। এ সময় সাথে থাকা বাচ্চা দোকানের ক্যাশে থাকা টাকা বা মোবাইল নিয়ে সটকে পড়ে। একই পন্থায় তারা স্বর্ণের দোকানেও চুরি করে থাকে।
 
ক্বিনব্রিজ : রাত একটু ঘনিয়ে আসলে নারী চোরচক্রের সদস্যরা নগরীর ক্বিনব্রিজের সামনে অবস্থান নেয়। এ সময় তারা সেতু পারাপারকারী পুরুষদের ঘিরে ধরে আপত্তিকর ছবি তুলে টাকা ও মোবাইল ফোন হাতিয়ে নেয়। কেউ না দিলে পুরুষ সহযোগিরা এগিয়ে এসে চোরচক্রের মহিলাদের সাথে আপত্তিকর ছবি তুলে টার্গেটকৃত পুরুষের। মান-সম্মানের ভয়ে ওই পুরুষ সাথে থাকা টাকা, মোবাইল সব দিয়ে চলে যান। ক্বিনব্রিজ ছাড়াও এই নারী অপরাধীদের তৎপরতা রয়েছে সুরমা পয়েন্ট, কদমতলী বাসস্ট্যান্ড, রেলওয়ে স্টেশন ও ওসমানী শিশু পার্ক এলাকায়।

ট্রেন : সিলেট থেকে ট্রেন ছেড়ে যাওয়া সময় যাত্রী বেশে নারী চোররা ট্রেনে ওঠে। অনেক সময় তারা টিকেট করে ওঠে, আবার অনেক সময় তারা টিকেট ছাড়া ওঠে। কোন কোন সময় যাত্রীকে টার্গেট করে তারা ট্রেনে ওঠে। ট্রেন গন্তব্যরে উদ্দেশ্যে যাত্রা করার পর যখন যাত্রীরা ঘুমিয়ে পড়ে তখন তারা এক বগি থেকে অন্য বগিতে গিয়ে তাদের টার্গেটকৃত যাত্রীর কাছে অবস্থান নেয়। এছাড়াও পাশের সিটে বসা মহিলা ঘুমিয়ে পড়লে গলার স্বর্ণের চেইন, মোবাইলসহ বিভিন্ন মালামাল চুরি করে মধ্যপথে নেমে যায়। সিলেট থেকে ওঠা চোররা চুরি শেষে শায়েস্তাগঞ্জে গিয়ে নেমে যায়। আর শায়েস্তাগঞ্জ থেকে আসা চোররা মোগলাবাজারে এসে নেমে যায় বলে জানা গেছে।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনা (মিডিয়া ও কমিউনিটি সার্ভিস) বি.এম আশরাফ উল্যাহ তাহের বলেন, নগরীতে অপরাধ-অপরাধীদের ধরতে পুলিশের অভিযান প্রতিদিন চলছে এবং গ্রেফতারও করা হচ্ছে। নারী চোরদের ধরতে মহিলা পুলিশ সদস্যরা কাজ করছে।-সূত্র: জালালাবাদ
ফেইসবুক কমেন্ট অপশন
এই বিভাগের আরো খবর
পুরাতন খবর খুঁজতে নিচে ক্লিক করুন


আমাদের ফেসবুক পেইজ