সোমবার, জুলাই ২২, ২০ ২৪
এস ডি সুব্রত::
৫ মে ২০ ২৩
৫:৫৭ অপরাহ্ণ

প্রখ্যাত পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত: এস ডি সুব্রত

বাংলাদেশের রাজনীতির উজ্জ্বল নক্ষত্র ,ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত পার্লামেন্টারিয়ান , আন্তর্জাতিক রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। যার বক্তব্য শোনার জন্য জনসভায় মানুষের ঢল নামতো , যার সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ তিনি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ।

যার গুরুত্বপূর্ণ ও রসালো বক্তব্য আর উক্তি জনমনে আশা ও আনন্দের বার্তা নিয়ে আসতো তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত । যাদের জ্ঞানগর্ভ বক্তব্যে জাতীয় সংসদ প্রাণবন্ত হয়ে উঠত তাদের মধ্যে মাটি বাংলার সিংহ পুরুষ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন অন্যতম ।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বেসামরিক লোকদের মধ্যে যে দু জন সাব সেক্টর কমান্ডার ছিলেন তাঁর মধ্যে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একজন। বাংলাদেশ সংবিধান রচনা কমিটির একমাত্র বিরোধী দলীয় সদস্য ছিলেন তিনি। তিনি সে সময় সংবিধানের অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিষয়ের বিরোধিতা করেছিলেন সাহসের সাথে । নিজ নির্বাচনী এলাকায় সেনবাবু নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন সাহসী এই নেতা ।

স্বাধীনতার পূর্ব থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখনও পর্যন্ত প্রভাব রেখে যাওয়া রাজনীতিবিদের অন্যতম ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। রাজনীতিক হিসেবে সর্বশেষ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য পদে থাকলেও তার দীর্ঘ রাজনৈতিক কেরিয়ারে ছিলেন নানা সময়ে নানা ভূমিকায়। সুপরিচিত এই রাজনীতিবিদের জন্ম ১৯৪৫ সালের ৫ মে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার আনোয়ারপুর গ্রামে ।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এরপর আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন সেন্ট্রাল ল কলেজ থেকে। রাজনৈতিক জীবনে সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের আগে ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জোয়ারের সময়েও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি থেকে মাত্র ২৫ বছর বয়সে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এই শক্তিমান রাজনীতিবিদ। নব্বই-এর দশকের শুরুতে তিনি যোগ দেন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে। "তিনি যখন পার্লামেন্টে বক্তৃতা করতেন, সকল সদস্য সেটা বিভোর হয়ে শুনতেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নাম সব সময় লেখা থাকবে। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুতে একজন মহান নেতাকে আমরা হারালাম, তার শূন্যতা পূরণ হওয়া অত সহজ নয়", বলছিলেন আওয়ামী লীগের আরেক সিনিয়র নেতা তোফায়েল আহমেদ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরি অংশ গ্রহণ করা এই রাজনীতিকের একটি অন্যতম পরিচয় ছিল সংবিধান এবং আইন বিশেষজ্ঞ হিসেবে।

মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির একজন কনিষ্ঠ সদস্য ছিলেন তিনি। অভিজ্ঞ এই রাজনীতিবিদ মানুষের মাঝে বেশি পরিচিত ছিলেন সংসদে তার চাতুর্যপূর্ণ এবং রসাত্মক বক্তব্যের জন্য।

রাজনীতিবিদ হিসেবে বিপক্ষের নেতাদেরও সমীহ পেয়েছেন তিনি।দলমত নির্বিশেষে তুমুল জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন এ প্রবীণ রাজনীতিবিদ। বিপক্ষের রাজনৈতিক বন্ধুদের সম্পর্কে তিনি বলতেন--"আমরা একই দলে কখনো কাজ করিনি, কিন্তু আমাদের বন্ধুত্ব থেকে গেছে।

সত্যিকার অর্থে রাজনীতিবিদ বলতে যেটা বোঝায়, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সেই রাজনীতিবিদদের মধ্যে অন্যতম। স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় প্রতিটি সংসদে তিনি ছিলেন, এটিই প্রমাণ করে যে তিনি একজন জনপ্রিয় জাতীয় নেতা ছিলেন"। 'বন্ধু সুরঞ্জিতের' মৃত্যুর পর প্রতিক্রিয়ায় বলেন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ।

প্রখ্যাত পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ষাটের দশকে ছাত্রজীবন থেকেই জড়িত ছিলেন বামপন্থী রাজনীতির সাথে। দীর্ঘদিন একসাথে রাজনীতি করেছেন বামপন্থী নেতা পঙ্কজ ভট্টাচার্যের সাথে। পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন বলছিলেন, সে সময় নাট্য-অভিনেতা হিসেবেও খ্যাতি ছিল মি. সেনগুপ্তের।

"হলগুলোর নাটকের প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ নাটকে সুরঞ্জিত অভিনয় করেছিল একাধিকবার। আমরা ঠাট্টা করে বলতাম, অভিনেতা থেকে নেতা হয়ে গেছো তুমি"। পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলছেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষায় সবসময়ই বড় ভূমিকা রেখেছেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।

তিনি মানুষের ভেতরের কথা বুঝতে পারতেন । খুব সহজেই জটিল সমস্যা সমাধানের এক জাদুকরী ক্ষমতা ছিল সেনগুপ্তের। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। পরে ২০১১ সালে রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেও কয়েক মাসের মাথায় মন্ত্রীত্ব হারান । পরে ছিলেন দপ্তরবিহীন মন্ত্রী হিসেবে।

মৃত্যুকালে জাতীয় সংসদে আইন বিচার এবং সংসদ বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতিও ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। ছাত্রজীবনেই রাজনীতির সাথে যুক্ত হন । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। থাকতেন জগন্নাথ হলে। তখনই জড়িয়ে পড়েন বাম ধারার ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে ।

ছাত্রাবস্থায় অভিনয়ের প্রতি ঝোঁক ছিল। তবে শেষপর্যন্ত অভিনয় আর টানেনি। অভিনেতা থেকে নেতা হয়ে গেলেন। অভিনয়ের চেয়ে রাজনীতির প্রতি টানটা বেশি ছিল বলেই রাজনীতিটাই অগ্রাধিকার পেয়েছিল। তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন শেষ হলো ২০১৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ইহজগতের মায়া ত্যাগের মাধ্যমে । প্রথমে ছিলেন বাম রাজনীতিতে।

সমাজতন্ত্র তথা বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ঠিক করেছিলেন। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের নেতৃত্বাধীন) প্রার্থী হিসেবে ১৯৭০ সালের পাকিস্তানভিত্তিক নির্বাচনে সুনামগঞ্জের একটি প্রাদেশিক পরিষদ আসনে জয়ী হয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের ওই জোয়ারের মুখেও তিনি নির্বাচিত হয়ে একদিকে যেমন নিজের জনপ্রিয়তার প্রমাণ দিয়েছিলেন, অন্যদিকে রাজনীতির আকাশে নতুন তারার উদয়বার্তারও ঘোষণা দিয়েছিলেন।

প্রথমে ছিলেন ছোট দলের বড় নেতা । ন্যাপের ঘর তার রাজনৈতিক আকাঙক্ষা পূরণের উপযুক্ত ছিল না। তিনি ন্যাপ ছেড়ে বামপন্থি অন্য দল গড়ার চেষ্টা করেছেন। একতা পার্টি, গণতন্ত্রী পার্টি ইত্যাদি। কিন্তু তার জন্য এই দলগুলো ছিল ছিল খুবই ছোট।

তাই এক সময় তিনি এ দেশের ঐতিহ্যবাহী এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগে যোগ দেন। আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। ছোট দল থেকে বড় দলে গিয়েও তিনি ছোট নেতা ছিলেন না। বড় দলেরও বড় নেতাই হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

এক–এগারোর সময় দলে সংস্কার প্রস্তাব করে তিনি অন্য তিন সিনিয়র নেতার সঙ্গে কিছুটা বেকায়দায় পড়েছিলেন। তারপরও ধাক্কা সামাল দিয়ে দলের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হয়েছিলেন। মন্ত্রীর মর্যাদায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন। আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। রেল মন্ত্রী হয়ে অবশ্য ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তাকে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়েছিল।

এটা ছিল তার অতি উজ্জ্বল রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে সবচেয়ে ম্লান অধ্যায়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তিনি যে যুক্তিশেল নিক্ষেপ করতেন তা ছিল অব্যর্থ। কি সরকারি দলে, কি বিরোধী দলে – সংসদে তিনি ছিলেন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। তাকে যারা অপছন্দ করতেন, তারাও তাকে উপেক্ষা করতে পারতেন না। তিনি নবীন সংসদ সদস্যদের কাছে তিনি ছিলেন শিক্ষকতুল্য।

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম পার্লামেন্টে তিনি একাই ছিলেন একশ। তার শানিত বক্তব্য সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনতো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও তাকে স্নেহ করতেন, পছন্দ করতেন। সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে তিনি কিছু বিষয়ে আপত্তি থাকায় স্বাক্ষর করেননি।

তিনি যেমন মানুষকে আপন করে নিয়েছেন, মানুষকে ভালো বেসেছেন, মানুষও তাকে সমান ভালোবাসা দিয়েছে। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আজীবন বেঁচে থাকবেন মানুষের মনের মণিকোঠায় উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হিসেবে ।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ। ০১৭১৬৭৩৮৬৮৮ । sdsubrata2022@gmail.com

ফেইসবুক কমেন্ট অপশন
এই বিভাগের আরো খবর
পুরাতন খবর খুঁজতে নিচে ক্লিক করুন


আমাদের ফেসবুক পেইজ